কেয়া মণ্ডল চৌধুরী
আমার কলম ঘাটাল মহকুমার জীবনবোধের শরিক। আমি সামাজিক সমস্যার নিভৃত কান্না, অভাবের নীরব দীর্ঘশ্বাস এবং সাধারণ মানুষের গভীর অভিযোগের সুর শুনতে ভালোবাসি। আমার লেখনি আলো-আঁধারের গাঢ় পটভূমি এড়িয়ে চলে। খুন-খারাপি, রাজনৈতিক জটিলতা বা তীব্র দুর্ঘটনার মর্মান্তিক দৃশ্য আমার উপজীব্য নয়। আমি ডুব দিই লোকায়ত জীবনের সরল জটিলতায়—ঘাটালের ধূলিকণা ও মানুষের আশা-হতাশা—এরাই আমার লেখনির প্রাণ। যা আমি ‘স্থানীয় সংবাদ’-এর মাধ্যমে তুলে ধরি।
কেয়া মণ্ডল চৌধুরী, ‘স্থানীয় সংবাদ’, ঘাটাল: আইনের চোখে প্রত্যেক অভিযুক্তেরই আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার রয়েছে। চোর, ডাকাত, গুণ্ডা, ধর্ষক কিম্বা অন্য কোনও অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালতে দাঁড়ালে তাঁর পক্ষেও একজন আইনজীবী থাকেন। নথি, সাক্ষ্যপ্রমাণ, তদন্তের ফাঁকফোকর কিংবা আইনের বিভিন্ন ধারা বিশ্লেষণ করে সেই আইনজীবী অভিযুক্তকে আইনি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। অনেক সময় জনমতের বিচারে তা অস্বস্তিকর মনে হলেও গণতান্ত্রিক বিচারব্যবস্থার এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। কারণ, অপরাধী কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার একমাত্র অধিকার আদালতের।
কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, যখন কোনও আইনজীবীর বিরুদ্ধে আদালতের সামনেই জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে, তখন বিষয়টি আর শুধুমাত্র আইনি লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন তা বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেও জড়িয়ে যায়।
ঘাটাল মহকুমার পকসো স্পেশাল আদালতে সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা একটি ঘটনা সেই প্রশ্নই সামনে এনে দিয়েছে। অভিযোগ, প্রকৃত আসামি ইসলাম খানের পরিবর্তে অন্য এক ব্যক্তি সাবির আলি খানকে আদালতে হাজির করিয়ে আত্মসমর্পণ ও জামিনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আরও গুরুতর বিষয় হল, ওই ব্যক্তি নিজেকে ইসলাম খান বলেই পরিচয় দিয়েছিলেন এবং সেই পরিচয়ের ভিত্তিতেই আদালতের কাছ থেকে জামিন পেয়েছিলেন।
ঘটনার সূত্রপাত হয় মূল অভিযোগকারীর আপত্তি থেকে। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে আদালত তদন্তের নির্দেশ দেয়। পুলিশের রিপোর্টে উঠে আসে, প্রকৃত অভিযুক্ত ইসলাম খান সেই সময়ে সৌদি আরবে ছিলেন। এমনকি তিনি ভারতে এসেও বিমানবন্দর থেকে ফিরে গিয়েছিলেন এবং পরে আবার সৌদি আরবে চলে যান। অর্থাৎ আদালতে উপস্থিত হয়ে জামিন নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
এরপরই আদালতের সামনে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়, তাহলে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো ব্যক্তি কে? এবং তিনি কীভাবে প্রকৃত অভিযুক্তের পরিচয়ে জামিন পেলেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আদালত কড়া অবস্থান নিয়েছে। নকল আসামিকে হেফাজতে নেওয়ার নির্দেশের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আইনজীবী বরুণকুমার শাসমলকে লিখিত কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে। আদালত জানতে চেয়েছে, কোন পরিস্থিতিতে তিনি ওই ব্যক্তিকে প্রকৃত ইসলাম খান বলে দাবি করে জামিনের আবেদন করেছিলেন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। আদালত এখনও আইনজীবীকে দোষী সাব্যস্ত করেনি। তাঁকে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আদালতের এই পদক্ষেপই বলে দিচ্ছে, অভিযোগটিকে কতটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
বিচারব্যবস্থার মূল ভিত্তি হল বিশ্বাস। আদালত ধরে নেয় যে, তার সামনে হাজির হওয়া ব্যক্তি নিজের পরিচয় সম্পর্কে সত্য তথ্য দিচ্ছেন এবং আইনজীবীরাও আদালতকে বিভ্রান্ত করার কোনও চেষ্টা করবেন না। সেই বিশ্বাসেই প্রতিদিন হাজার হাজার মামলার শুনানি চলে। যদি সেই বিশ্বাসের ভিতেই ফাটল ধরে, তাহলে শুধু একটি মামলাই নয়, গোটা বিচার প্রক্রিয়াই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
তাই একজন আইনজীবী অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির পাশে দাঁড়াবেন, সেটাই তাঁর পেশাগত দায়িত্ব। কিন্তু যদি আদালতের সামনে প্রকৃত আসামির বদলে অন্য কাউকে হাজির করানোর মতো অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়, তাহলে তা নিছক আইনি কৌশল নয় বিচারব্যবস্থার ভিতকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো গুরুতর ঘটনা বলেই বিবেচিত হবে। এখন নজর আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে। কারণ এই মামলার ফলাফল শুধু একজন অভিযুক্ত বা একজন আইনজীবীর ভবিষ্যৎ নয়, আদালতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে।
