কেয়া মণ্ডল চৌধুরী
আমার কলম ঘাটাল মহকুমার জীবনবোধের শরিক। আমি সামাজিক সমস্যার নিভৃত কান্না, অভাবের নীরব দীর্ঘশ্বাস এবং সাধারণ মানুষের গভীর অভিযোগের সুর শুনতে ভালোবাসি। আমার লেখনি আলো-আঁধারের গাঢ় পটভূমি এড়িয়ে চলে। খুন-খারাপি, রাজনৈতিক জটিলতা বা তীব্র দুর্ঘটনার মর্মান্তিক দৃশ্য আমার উপজীব্য নয়। আমি ডুব দিই লোকায়ত জীবনের সরল জটিলতায়—ঘাটালের ধূলিকণা ও মানুষের আশা-হতাশা—এরাই আমার লেখনির প্রাণ। যা আমি ‘স্থানীয় সংবাদ’-এর মাধ্যমে তুলে ধরি।
কেয়া মণ্ডল চৌধুরী, ‘স্থানীয় সংবাদ’, ঘাটাল: ঘাটাল মহকুমায় ক্রমবর্ধমান শব্দদূষণের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে শব্দদানব বিরোধী ঐক্য মঞ্চ। ওই সংগঠনের অভিযোগ, বিভিন্ন ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শোভাযাত্রা এবং অন্যান্য জনসমাগমে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মাইক, লাউডস্পিকার ও ডিজের ব্যবহার সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে। বিশেষ করে প্রবীণ নাগরিক, অসুস্থ ব্যক্তি, শিশু, পরীক্ষার্থী এবং কর্মজীবী মানুষ এই শব্দদূষণের কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
সংগঠনের দাবি, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন, আদালতের নির্দেশিকা এবং প্রশাসনিক বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও বহু ক্ষেত্রে তার কার্যকর প্রয়োগ দেখা যায় না। অনুমতি ছাড়া মাইক ব্যবহার, নির্ধারিত শব্দসীমা অতিক্রম করা এবং রাত ১০টার পর উচ্চস্বরে শব্দবর্ধক যন্ত্র বাজানো এখন অনেক এলাকায় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে।
২০২৩ সালে গঠিত এই নাগরিক মঞ্চ ঘাটাল মহকুমার বিভিন্ন এলাকার সচেতন মানুষের উদ্যোগে শব্দদূষণের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ে তোলা এবং প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণের লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে। সংগঠনের সদস্যদের বক্তব্য, তারা কোনও ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা করতে চান না, বরং আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং নাগরিক অধিকারের সুরক্ষাই তাদের মূল উদ্দেশ্য।
মঞ্চের অভিযোগ, বহু ক্ষেত্রে প্রশাসনের কাছে লিখিত ও মৌখিকভাবে অভিযোগ জানানো হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্বিকার ভূমিকা পালন করে। অভিযোগের পরেও অনেক সময় বেআইনিভাবে মাইক ও ডিজে বাজানো বন্ধ হয় না। এর ফলে আইন লঙ্ঘনকারীরা আরও উৎসাহিত হয় এবং সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ণ হয় বলে দাবি সংগঠনের।
সম্প্রতি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীও প্রকাশ্যে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন এবং আইন মেনে চলার ওপর জোর দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলেই দাবি মঞ্চের। তাদের মতে, মুখ্যমন্ত্রীর অবস্থান স্পষ্ট হলেও প্রশাসনের একাংশ এখনও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে অনীহা দেখাচ্ছে। ফলে শব্দদূষণ রোধে আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
প্রশাসনের কাছে মঞ্চ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিটি সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নিয়মিত শব্দমাত্রা পর্যবেক্ষণ, লাইসেন্স ছাড়া বা অনুমোদিত সীমার বাইরে মাইক ও ডিজে ব্যবহার হলে তাৎক্ষণিক বাজেয়াপ্তসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ, রাত ১০টার পর সম্পূর্ণভাবে মাইক ও ডিজে নিষিদ্ধ করা এবং সাধারণ মানুষের অভিযোগ দ্রুত ও সংবেদনশীলভাবে নিষ্পত্তি করা।
সংগঠনের মতে, উৎসব উদযাপনের অধিকার যেমন সকলের রয়েছে, তেমনি শান্তিতে বসবাসের অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই একটি সুস্থ, মানবিক ও বাসযোগ্য সমাজ গড়ে তুলতে শব্দদূষণের বিরুদ্ধে প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগের উপর জোর দিয়েছে শব্দদানব বিরোধী ঐক্য মঞ্চ।