কাজলকান্তি কর্মকার, ঘাটাল: দাসপুর থানার খেপুত গ্রামে আজও নিষ্ঠা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের প্রায় ২২৪ বছরের প্রাচীন কালীপুজো। শুধু একটি পারিবারিক পুজো নয়, সময়ের সঙ্গে এই আরাধনা হয়ে উঠেছে গোটা এলাকার মানুষের আবেগ, বিশ্বাস ও মিলনোৎসব। কয়েক শতাব্দী ধরে বংশপরম্পরায় চলে আসা নানা প্রাচীন আচার ও রীতিনীতি আজও এই পুজোর অন্যতম আকর্ষণ।
সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের জমিদারির ইতিহাসের সূত্রপাত কলকাতার বড়িশায়। পরিবারের প্রথম পুরুষ লক্ষ্মীকান্ত রায়চৌধুরীর হাত ধরে সেই জমিদারির প্রতিষ্ঠা। পরবর্তী সময়ে, আনুমানিক ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে পরিবারের ২৭তম বংশধর রামদুলাল রায়চৌধুরী বর্ধমানের রাজা তেজচাঁদের কাছ থেকে মেদিনীপুরের চেতুয়া পরগনার জমিদারি লাভ করেন। এরপর খেপুত গ্রামে তাঁদের বসতি গড়ে ওঠে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে সেখানে একটি ত্রিতল অট্টালিকাও নির্মাণ করেন তিনি।
পরিবারের ইতিহাস অনুযায়ী, কালীয়াটে বংশের ইষ্টদেবীর বৈষ্ণবী রূপ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন রামদুলাল। সেই দেবীমূর্তির আদলেই খেপুতের বাড়িতে কালীপুজো শুরু করার সংকল্প করেন তিনি। সেই থেকেই খেপুতের সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের শ্যামা আরাধনার সূচনা। দেবীর নাসিকায় রসকলি ও কপালে বৈষ্ণবী তিলক এই প্রতিমার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। কালীঘাটের বৈষ্ণবী রূপিণী কালীর পুজোর রীতির সঙ্গেও এই আরাধনার যোগ রয়েছে।
এই পুজোর অন্যতম বিশেষত্ব প্রতিমা নির্মাণ থেকে শুরু করে বিসর্জন পর্যন্ত নানা প্রাচীন প্রথার অনুসরণ। দশমীর দিন পরিবারের প্রবীণতম সদস্যের হাত ধরেই দেবীর পায়ে প্রথম মাটি দেওয়ার রীতি রয়েছে। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে প্রদীপের শিখা ও তেলের সাহায্যে দেবীর গায়ের কালো রং তৈরি করা হয়। শন দিয়ে পরিবারের সদস্যরাই তৈরি করেন দেবীর কেশ। প্রতিমার চক্ষুদানের সময় চালকুমড়ো বলিরও প্রথা রয়েছে। পুজোর আগের দিন মঙ্গল আরতির মাধ্যমে দেবীকে আবাহন জানানো হয়। পুজোর সময় নির্ঘণ্ট নির্ধারণে আজও ব্যবহার করা হয় প্রাচীন জলঘড়ি। সেই জলঘড়ির সময় মেনেই বাজি প্রদর্শনীর মাধ্যমে ইশারা পুকুরে দেবীর ঘট বিসর্জনের পর্ব সম্পন্ন হয়।
পুজোয় ছাগবলির রীতি রয়েছে। একসময় মহিষ ও মেষ বলিরও প্রচলন ছিল, যদিও বর্তমানে সেই প্রথা বন্ধ হয়েছে। শ্যামাপুজোর সময় বাড়ির অন্যান্য দেবদেবীর নিত্যসেবাতেও বিশেষ নিয়ম মানা হয়। পরিবারের শ্রীরঘুনাথজিউয়ের প্রতিদিন দুপুরে অন্নভোগ দেওয়া হলেও কালীপুজোর দিন দুপুরে সেই ভোগ নিবেদন করা হয় না। রাতে শ্যামাকালীর ভোগ নিবেদনের আগে রঘুনাথজিউ নিরামিষ ভোগ দর্শন করেন। এরপর শিব ও শ্যামাকালীর ভোগ নিবেদনের পালা।
সাবর্ণ পরিবারের কালীপুজোর ভোগও বেশ বৈচিত্র্যময়। পরিবারের সদস্যদের সূত্রে জানা যায়, দেবীকে মোট ১৩ ধরনের পদ নিবেদন করা হয়। কলার বড়া, লুচি ও বিভিন্ন সব্জির তরকারির পাশাপাশি বিশেষ আকর্ষণ শোল মাছ পোড়া। পরিবারের দীক্ষিত মহিলারাই ভোগ রান্নার দায়িত্ব সামলান। অন্যদিকে পুরুষ সদস্যরা নৈবেদ্য সাজানো, ফল কাটা ও পান সাজানোর কাজে ব্যস্ত থাকেন।
পুজোর পরদিন দেবীর নিরঞ্জন সম্পন্ন হওয়ার পর সপরিবারে প্রদক্ষিণ করে মায়ের নির্মাল্য মন্দিরে রেখে দেওয়া হয়। সারা বছর সেই নির্মাল্য সংরক্ষিত থাকে। ওই দিন সন্ধ্যায় আটচালায় অনুষ্ঠিত হয় নরনারায়ণ সেবা। খেপুত-সহ আশপাশের গ্রামের বহু মানুষ এই ভোগ গ্রহণ করতে আসেন। একসময় প্রায় হাজারখানেক মানুষকে ভোগ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হতো। পুজোর ব্যয়ভার মূলত সাবর্ণ রায়চৌধুরী গোষ্ঠী সংসদ বহন করে। পারিবারিক চাঁদার পাশাপাশি দেবোত্তর সম্পত্তি থেকেও পুজোর খরচ মেটানো হয়।
এই পুজোর আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল সামাজিক সম্প্রীতি ও সর্বজনীন অংশগ্রহণ। জমিদারি প্রতিষ্ঠার সময় বিভিন্ন পেশার মানুষের বসতি গড়ে উঠেছিল পরিবারের বাড়ির আশপাশে। সেই ঐতিহ্য আজও বজায় রয়েছে। ছুতোর, নাপিত, গয়লা, কামার ও মালাকার সম্প্রদায়ের মানুষজন বংশপরম্পরায় এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি তাঁদের অংশগ্রহণেই পুজোটি হয়ে ওঠে বৃহত্তর সামাজিক মিলনক্ষেত্র।
খেপুত উত্তরবাড়িতে বর্তমানে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের প্রায় ২৩-২৪টি পরিবার বসবাস করে। পরিবারের সদস্য সংখ্যা প্রায় চারশো। পুজোর সময় তাঁদের অনেকেই একত্রিত হন। একসময় পুজো উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নানা আয়োজনের জৌলুস ছিল চোখে পড়ার মতো। জমিদারি প্রথার অবসানের পর সেই জাঁকজমক কিছুটা কমলেও মূল ধর্মীয় আচার ও পারিবারিক ঐতিহ্যে কোনও ছেদ পড়েনি।
সাবর্ণদের পুজোকে কেন্দ্র করে খেপুত গ্রামেও কালী আরাধনার ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। গ্রামে ছোটো রায়বাড়ি, চট্টোপাধ্যায় ও নাগবাড়ির মতো আরও কয়েকটি প্রাচীন পরিবারেও ঐতিহ্য মেনে কালীপুজো হয়। সব মিলিয়ে গ্রামে প্রথাগতভাবে প্রায় ন’টি প্রাচীন কালীপুজোর প্রচলন রয়েছে। গ্রামের অধিষ্ঠাত্রী দেবী খেপুতেশ্বরীর কাছে পুজোর ডালা নিবেদন করার পরই বিভিন্ন বাড়িতে কালীপুজোর সূচনা হয়। সাবর্ণ পরিবারও নিজেদের বাড়ি থেকেই খেপুতেশ্বরীকে পুজো নিবেদন করে।
ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি মানত করার জন্যও এই বাড়ির পুজোর বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। একসময় পাগলা কুকুর বা শেয়ালের কামড়ের পর সুস্থতার আশায় বহু মানুষ এখানে মানত করতে আসতেন। বিজ্ঞানের প্রসারের সঙ্গে সেই প্রবণতা কিছুটা কমলেও এখনও অনেকে এই প্রথা মেনে মানত করতে আসেন।
দীর্ঘ ২২৪ বছর ধরে নানা পরিবর্তনের সাক্ষী থেকেছে খেপুতের সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের এই কালীপুজো। সময়ের সঙ্গে জমিদারি জৌলুস কমেছে, বদলেছে সামাজিক পরিস্থিতি। কিন্তু প্রাচীন আচার, পারিবারিক নিষ্ঠা এবং গ্রামের মানুষের অংশগ্রহণে আজও অমলিন এই শ্যামা আরাধনা। আগামী প্রজন্মের হাত ধরে এই ঐতিহ্যও এভাবেই বেঁচে থাকবে, এমনটাই প্রত্যাশা খেপুতবাসীর।








