কেয়া মণ্ডল চৌধুরী, ‘স্থানীয় সংবাদ’, ঘাটাল: পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মভূমিতে আজও যেন মায়েদের গল্প লেখা হয়। যে মাটির ছেলে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর মায়ের ভালোবাসা আর ত্যাগকে সঙ্গে নিয়ে জীবনে অনেক দূর এগিয়েছিলেন, সেই মাটিরই আর এক ছেলে তপন দাস। একসময় যে বাড়ির চাল ফুটো হয়ে বৃষ্টির জল ঘরে পড়ত, বই কেনার সামর্থ্য ছিল না, অনেক সময় দুবেলা দুমুঠো খাবারও ঠিকমতো জুটত না, আজ সেই তপনই মেদিনীপুর কলেজের সংস্কৃত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। এই গল্পটা শুধু তপনের নয়। এই গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন মায়ের অনেক কষ্ট, আর ছেলেকে নিয়ে দেখা একটা স্বপ্ন। সেই মা পুতুলদেবী।
খড়ার পৌরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের উদয়গঞ্জে মা পুতুল দাস, বাবা শঙ্কর দাস এবং দুই দিদিকে নিয়ে তপনের বেড়ে ওঠা। সংসারে চরম অভাব ছিল। বাবা রোজগার করলেও সংসারের দায়িত্ব সেই ভাবে নিতে পারেননি। তাই সংসার চালানোর দায়িত্বটা এসে পড়েছিল তপনের মায়ের ওপর। লোকের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালিয়েছেন, আবার সেই সংসারের মধ্যেই ছেলের পড়াশোনাটাও চালিয়ে গেছেন।
ছোটবেলায় তপনের বই কেনার মতো সামর্থ্য ছিল না। পাশের বাড়ির এক দাদা পুরোনো বই দিয়ে সাহায্য করতেন। অষ্টম, নবম শ্রেণি পর্যন্ত কোনও টিউশনও ছিল না, তবে স্কুলের শিক্ষকরা অনেকেই তপনকে সাহায্য করেছেন। পরামানিকপাটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শুরু করে পরে বীরসিংহ ভগবতী বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে স্কুলের অনেক শিক্ষক তাঁকে বিনা পয়সায় পড়িয়েছেন। খড়ার রামকৃষ্ণ মিশন থেকেও পেয়েছেন অনেক সহযোগিতা।
বাড়ির অবস্থা এমন ছিল যে বর্ষাকালে চাল ফুটো হয়ে ঘরের মধ্যে জল পড়ত। কোনও কোনও দিন খাবারও ঠিকমতো জুটত না। কিন্তু এসবের মধ্যেও পড়াশোনা ছাড়েননি তপন। বরং যত বাধা এসেছে, পড়াশোনার প্রতি তাঁর জেদ যেন আরও বেড়েছে।
২০০৮ সালে মাধ্যমিকে ৮০ শতাংশ এবং ২০১০ সালে উচ্চমাধ্যমিকে ৭৫ শতাংশ নম্বর নিয়ে পাশ করেন তপন। এরপর বেলুড়ের বিবেকানন্দ ইউনিভার্সিটিতে সংস্কৃত নিয়ে অনার্সে ভর্তি হন। ২০১৫ সালে সেখান থেকেই মাস্টার্স শেষ করেন। এরপর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল করার সুযোগ আসে। কিন্তু আর্থিক সমস্যা তখনও তাঁর ছিল। সেই সময় রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজরা তপনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁদের সহযোগিতা আর নিজের পরিশ্রমকে সঙ্গে নিয়ে তপন নেট কোয়ালিফাই করেন, এমফিলও শেষ করেন। ২০১৬ সালের মাঝামাঝি তাঁর ইন্টারভিউতে ডাক আসে। তারপর ২০১৭ সালে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন, যার জন্য এতদিনের অপেক্ষা। মেদিনীপুর কলেজের সংস্কৃত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন তপন।
নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পর তপন কিন্তু প্রথমে নিজের কথা ভাবেননি। ভেবেছেন সেই মায়ের কথা, যিনি নিজের কষ্টের কথা ভুলে ছেলেকে পড়িয়েছেন। এমফিল করার সময় ফেলোশিপ থেকে যে টাকা পেতেন, সেখান থেকেই মাকে কিছু কিছু করে টাকা পাঠাতেন। যিনি লোকের বাড়িতে কাজ করে ছেলেকে মানুষ করেছেন, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পর সেই মাকে আর কাজ করতে দেননি তপন।
বাবা-মায়ের জন্য বাড়ি তৈরি করে দিয়েছেন। দুই দিদির পাশেও দাঁড়িয়েছেন। একসময় যে পরিবারে অভাব ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী, আজ সেই পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন তপন।
এখনও নিজের সংসার করা হয়ে ওঠেনি তপনের। বিয়ের কথা উঠলে বলেন, আর একটু গুছিয়ে নিয়ে, তারপর বিয়ে করব। কারণ তাঁর কাছে এখনও বাবা-মা, দুই দিদি এবং পরিবারের দায়িত্বটাই আগে। নিজের কথা পরে।
তপনের জীবনের এই পথটায় তিনি একা ছিলেন না। পাশে ছিলেন তাঁর মা, স্কুলের শিক্ষকরা, রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজরা এবং আরও অনেক মানুষ, যাঁরা বিভিন্ন সময়ে তাঁকে সাহায্য করেছেন। আর ছিল তপনের নিজের চেষ্টা।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনে মা ভগবতীদেবী যেমন ছিলেন তাঁর শক্তি, তেমনই তপনের জীবনে তাঁর মা পুতুলদেবী। একজন মা ছেলের ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করে গেছেন। সেই লড়াই আজ সার্থক হয়েছে। যে মা একদিন লোকের বাড়িতে কাজ করে ছেলেকে পড়িয়েছেন, আজ সেই মায়ের ছেলে কলেজের অধ্যাপক। একসময় যাঁর নিজের বই কেনার সামর্থ্য ছিল না, আজ সেই তপনই অন্যের সন্তানদের পড়াচ্ছেন।
জীবনে অভাব থাকলে অনেক সময় আমরা ভেঙে পড়ি, মনে হয় আমাদের দিয়ে আর কিছু হবে না। তপনের গল্পটা সেখানেই অন্যরকম। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, অভাব থাকলেও স্বপ্ন দেখা যায়, আর সেই স্বপ্নের জন্য লড়াই করাও যায়।
এই গল্পটা সেইসব মা-বাবারও গল্প, যাঁরা নিজেদের কষ্ট ভুলে সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করে যান। তপন শুধু তাঁর পরিবারের অহংকার নয়, আমাদের মহকুমাবাসীর কাছেও অনুপ্রেরণার এক গল্প।