কেয়া মণ্ডল চৌধুরী
আমার কলম ঘাটাল মহকুমার জীবনবোধের শরিক। আমি সামাজিক সমস্যার নিভৃত কান্না, অভাবের নীরব দীর্ঘশ্বাস এবং সাধারণ মানুষের গভীর অভিযোগের সুর শুনতে ভালোবাসি। আমার লেখনি আলো-আঁধারের গাঢ় পটভূমি এড়িয়ে চলে। খুন-খারাপি, রাজনৈতিক জটিলতা বা তীব্র দুর্ঘটনার মর্মান্তিক দৃশ্য আমার উপজীব্য নয়। আমি ডুব দিই লোকায়ত জীবনের সরল জটিলতায়—ঘাটালের ধূলিকণা ও মানুষের আশা-হতাশা—এরাই আমার লেখনির প্রাণ। যা আমি ‘স্থানীয় সংবাদ’-এর মাধ্যমে তুলে ধরি।
কেয়া মণ্ডল চৌধুরী, ‘স্থানীয় সংবাদ’, ঘাটাল: দাসপুর গঞ্জের বিডিও অফিসের ঠিক উল্টো দিকে থাকা ইমিটেশনের গয়নার দোকানটি একসময় ছিল সঞ্চালী সাউয়ের জীবনের একমাত্র ভরসা। ওই দোকানেই তাঁর স্বামী সজল সাউ স্বপ্ন দেখেছিলেন—সংসার চলবে, দুই ছেলেকে মানুষ করা যাবে। কিন্তু সময়ের নিষ্ঠুর আঘাতে সেই স্বপ্ন আজ শুধুই স্মৃতি।
২০২১ সালে করোনা কেড়ে নেয় সঞ্চালীদেবীর স্বামীকে। হঠাৎ করেই সংসারের মাথার ছায়া সরে যায়। তখন দুই ছেলেকে সামনে রেখে নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। দাসপুরের পুরানো হাট তলার বাসিন্দা সঞ্চালীদেবী বাড়ির সামনেই স্বামীর রেখে যাওয়া ওই ইমিটেশনের গয়নার দোকানটাই ছিল তাঁদের একমাত্র আয়ের রাস্তা। সেই দোকান সামলেই প্রৌঢ়া সংসার চালাতেন।
কিন্তু দুঃখের শেষ সেখানেই নয়! ২০২৪ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে এক মর্মান্তিক বাইক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় সঞ্চালীদেবীর ছোট ছেলে। সন্তান হারানোর যন্ত্রণা কোনও ভাষায় ধরা যায় না। সেই ঘটনার পর থেকে তাঁর জীবনে নেমে আসে গভীর শূন্যতা। তবু বেঁচে থাকার তাগিদে দোকান খুলে বসতেন তিনি, কারণ জীবন থেমে থাকে না।
বড় ছেলে সদ্য বিয়ে করে বাইরে আলাদা সংসার পেতেছেন। তাঁর আয়ও খুবই সামান্য; নিজের সংসার চালাতেই তাঁকে হিমশিম খেতে হয়। ফলে মায়ের দায়িত্ব নেওয়ার মতো অবস্থায় তিনি নেই। সঞ্চালীদেবী নিজেই ওই দোকান থেকে নিজের খরচ কোনোমতে চালিয়ে নিতেন। এমন অবস্থায় আসে আরেকটি বড় আঘাত। যে বাড়িতে ইমিটেশনের দোকানটি ছিল, সেই বাড়ির মালিক বাড়িটি অন্য একজনকে বিক্রি করে দেওয়ায় নতুন মালিক সঞ্চালীদেবীকে দোকান ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অর্থাৎ, জীবনের শেষ অবলম্বনটুকুও আজ হারানোর মুখে।
বর্তমানে দিশেহারা সঞ্চালীদেবী বলেন, স্বামী চলে গেছে, ছোট ছেলে চলে গেছে। বড় ছেলেটা নিজের মতো করে বাঁচার চেষ্টা করছে। এই দোকানটাই ছিল আমার ভরসা। এটা চলে গেলে আমি আর কী করে চলব, বুঝে উঠতে পারছি না!
ষাট ছুঁই-ছুঁই সঞ্চালীদেবী আজ একা। কোনো অভিযোগ নেই, কোনো দাবি নেই তাঁর; আছে শুধু হারানোর ক্লান্তি আর অনিশ্চিত আগামীর ভয়। দাসপুরের সেই ইমিটেশনের গয়নার দোকানটি তাই আজ আর শুধু একটি দোকান নয়, তা এক মায়ের হারিয়ে যাওয়া জীবনের শেষ স্মৃতিচিহ্ন। এই কাহিনী কোনো অসাধারণ মানুষের নয়, এই কাহিনী আমাদের সমাজের এক সাধারণ নারীর।
কোনো নাটক নয়, কোনো কল্পনাও নয়; তবু চোখের জল লুকিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।