তৃপ্তি পাল কর্মকার, ‘স্থানীয় সংবাদ’, ঘাটাল: হুগলি জেলার রাজহাটির শান্ত জনপদে এই বছরের সরস্বতী পুজো কেবল পুষ্পাঞ্জলি আর বিদ্যার দেবীর আরাধনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রইল না, বরং তা হয়ে উঠল এক সামাজিক বিপ্লবের পটভূমি। স্থানীয় পাল পরিবারের সদস্য রাজর্ষি পাল ও সুচেতা পাল তাঁদের

বাড়ির আঙিনায় দেবী সরস্বতীর আরাধনার পাশাপাশি এক অনন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা তাঁদের দুই যমজ কন্যা, শারন্যা এবং রাজন্যাকে দেবী রূপে আবাহন করে কুমারী পুজোর আয়োজন করেন। তিন বছর আট মাস বয়সী দুই খুদেকে লাল পাড় শাড়ি এবং গয়নায় সাজিয়ে যখন দেবীর আসনে বসানো হয়, তখন তা প্রথাগত শাস্ত্রীয় আচারের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে মানবিক ও প্রগতিশীল চিন্তার প্রতিফলন হিসেবে।
সাধারণত বাঙালি সমাজ মহাষ্টমীর সকালে কুমারী পুজোর সঙ্গে পরিচিত, যা মূলত দুর্গাপুজো, বাসন্তী পুজো কিংবা জগদ্ধাত্রী পুজোর বিশেষ অঙ্গ। সরস্বতী পুজোয় সচরাচর এমন আয়োজন চোখে পড়ে না। রাজর্ষি ববু পেশায় পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশপুর গ্রামীণ হাসপাতালের ল্যাব টেকনিশিয়ান হলেও মনের দিক থেকে তিনি একজন সমাজ-সচেতন মানুষ। কুমোর সম্প্রদায়ের সন্তান হয়েও তিনি অনুভব করেছিলেন যে, আধ্যাত্মিকতা বা ভক্তির জগতে কোনো বর্ণবিভেদ বা জাতপাতের স্থান থাকতে পারে না। দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা ধারণা যে কুমারী পুজো কেবল একটি নির্দিষ্ট বর্ণের শিশুদের নিয়ে করতে হবে, সেই প্রথাকে পাশ কাটিয়ে তিনি সমাজের সকল স্তরের মানুষকে এক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, প্রতিটি কন্যাই দেবী আদ্যাভক্তির অংশ, আর তাঁদের সম্মান প্রদর্শন করা মানেই সমগ্র নারী জাতিকে শ্রদ্ধার আসনে বসানো। পুজোর দিন রাজহাটির এই ছোট্ট বাড়ির পরিবেশ ছিল এক ঐশ্বরিক শান্তিতে ঘেরা। পুরোহিত অমিয় মিশ্র যখন শাস্ত্রীয় মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে দুই খুদে কুমারীকে দেবীরূপে বরণ করছিলেন, তখন সেখানে উপস্থিত পাড়া-প্রতিবেশীরা এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হন। শাস্ত্রমতে পূজা শেষে দুই বোনের নামকরণ করা হয় ‘সরস্বতী’। এই আয়োজনের মাধ্যমে রাজর্ষি ও সুচেতা দেবী এই বার্তাই দিতে চাইলেন যে, কন্যাসন্তানরা পরিবারের গৌরব এবং তারা শ্রদ্ধার যোগ্য। কন্যাসন্তানদের দেবী জ্ঞানে পুজো করার এই সাহসী পদক্ষেপ সমাজকে পথ দেখাবে—যেখানে প্রতিটি মেয়েই পাবে তার প্রাপ্য মর্যাদা এবং ভালোবাসার অধিকার। রাজহাটির এই ছোট্ট উদ্যোগটি আজ হয়ে উঠেছে লিঙ্গ বৈষম্য ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এক সরব ও সুন্দর প্রতিবাদ।








