• তৃপ্তি পাল কর্মকার, ‘স্থানীয় সংবাদ’, ঘাটাল: চন্দ্রকোণা থানার ঝাঁকরা হাইস্কুল। বাইরের শান্ত রূপের আড়ালে এই বিদ্যামন্দির বর্তমানে এক প্রবল বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। গত ৪ অক্টোবর রাতের অন্ধকারে ক্ষুব্ধ জনতা, অভিভাবক ও প্রাক্তনীদের তুমুল বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে স্কুল চত্বর। কাঠগড়ায় খোদ প্রধান শিক্ষক সুকুমার মণ্ডল। অভিযোগ, বাড়ি মাত্র চার কিলোমিটার দূরে খাঁপুরে হলেও, তিনি ২০১৯ সাল থেকে স্কুলের দোতলার একটি ঘরে রীতিমতো সংসার পেতেছেন। সেখানে খাট, বিছানা থেকে রান্নার সরঞ্জাম, সবই মজুত। অভিযোগের সুর আরও চড়িয়ে গ্রামবাসীরা দাবি করেছেন, রাতের অন্ধকারে সিসিটিভি বন্ধ করে মহিলাদের দিয়ে সাফাইয়ের নামে অনৈতিক কাজ চলে সেখানে। পাশাপাশি মিড-ডে মিলের চাল চুরির মতো গুরুতর অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। জনরোষ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ এসে তাঁকে উদ্ধার করে বাড়ি পাঠাতে বাধ্য হয়। প্রধান শিক্ষক স্কুলের রুম দখল করে থাকার কথা স্বীকার করে নিয়ে জানান, তিনি স্কুলের স্বার্থেই স্কুলে বসবাস করেন।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠের গল্পটা বড়ই মর্মস্পর্শী এবং চিন্তায় ফেলার মতো। যে মানুষটির বিরুদ্ধে এত ক্ষোভ, সেই সুকুমারবাবু (এমএসসি ম্যাথমেটিক্স, বিএড) নিজের ঘর-সংসার ছেড়ে স্কুলটাকেই আপন করে নিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, স্কুল পরিচ্ছন্ন রাখা এবং সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণের স্বার্থেই তাঁর এই আত্মত্যাগ। অতীতেও এই স্কুলে প্রধান শিক্ষকদের থাকার এক অলিখিত পরম্পরা ছিল বলে তিনি জানান। তাঁর এই দাবিকে প্রবলভাবে সমর্থন করেছেন তাঁরই একসময়ের শিক্ষক তথা ওই স্কুলের প্রাক্তনী চিত্তরঞ্জন ঘোষ। তাঁর চোখে সুকুমার এক অত্যন্ত মেধাবী, সৎ ও আদর্শবান ছাত্র। চিত্তরঞ্জনবাবুর আক্ষেপ, যে মানুষটা রাত জেগে স্কুলকে পাহারা দেন বলেই আজ সেখানে বহিরাগতদের মদের আসর বসে না, তাঁর বিরুদ্ধেই আজ চুরির অপবাদ! তাঁর আশঙ্কা, রাজনৈতিক দূষণ এবং সংকীর্ণ স্বার্থের শিকার হয়ে স্থানীয়রা নিজেদের পায়েই কুড়ুল মারছেন।
এই ঘটনার গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিক্ষোভের আসল শিকড় হয়তো লুকিয়ে রয়েছে অন্য কোথাও। সুব্রত হাজরা নামে এক উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তির মতে, এই গোটা ঘটনা আসলে এক সৎ প্রশাসকের বিরুদ্ধে স্বার্থান্বেষী মহলের গভীর ষড়যন্ত্র। সুকুমারবাবু স্কুলের বেদখল হয়ে যাওয়া সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের জন্য পুরনো দলিল ঘাঁটতে শুরু করেছিলেন। স্বভাবতই, যারা বেআইনিভাবে স্কুলের জমি দখল করে রেখেছিল, তাদের গায়ে আঁচড় লেগেছে। শুধু তাই নয়, প্রশাসক হিসেবে তিনি অত্যন্ত কড়া। শিক্ষকদের ‘লেট অ্যারাইভাল’ এবং ‘আর্লি ডিপার্চার’ তিনি কড়া হাতে বন্ধ করেছিলেন। ফাঁকিবাজদের তিনি প্রতিনিয়ত মনে করাতেন সরকারের প্রতি তাঁদের দায়িত্বের কথা। এই কঠোর নিয়মানুবর্তিতাই সম্ভবত তাঁর কাল হয়েছে। স্বার্থে ঘা লাগায় কিছু নেশাগ্রস্ত মানুষকে সামনে রেখে তাঁকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা চলছে বলে দাবি সুব্রতবাবুর।
একদিকে গ্রামবাসীদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও অনৈতিক কাজের গুরুতর অভিযোগ, অন্যদিকে একজন কঠোর, নিয়মানুবর্তী প্রধান শিক্ষকের স্কুল বাঁচানোর নিঃস্বার্থ লড়াই। সত্য ঠিক কোথায় লুকিয়ে আছে, তা প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্তেই আগামী দিনে স্পষ্ট হবে। তবে এই কাদা ছোঁড়াছুড়ির খেলায় সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে শিক্ষাঙ্গনের পবিত্রতার। একজন আদর্শবান শিক্ষক যদি সত্যিসত্যিই চক্রান্তের শিকার হন, তবে তা গোটা সমাজের কাছে এক চরম লজ্জার। আবার অভিযোগ আংশিক সত্যি হলেও তা শিক্ষার মূল কাঠামোর প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা। সব মিলিয়ে, ঝাঁকরা হাইস্কুলের এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, সমাজ আজ কতটা বিভক্ত। সত্যের পথে যে ঝড় আসে, তা একদিন থামবে ঠিকই, কিন্তু ততদিনে শিক্ষার এই মন্দিরে যে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হল, তা কি সহজে মুছবে?