সৈয়দ সাব্বির আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক, বেঙ্গল ব্রিক ফিল্ড ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন, কলকাতা: ইট শিল্প দেশের অন্যতম বৃহৎ শ্রমনির্ভর শিল্প। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার এই শিল্পের উপর জীবিকা নির্বাহ করেন। একই সঙ্গে এই শিল্প সরকারকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব প্রদান করে এবং নির্মাণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করে।
সম্পূর্ণ খোলা আকাশের নীচে, প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করেই এই মরশুমি শিল্পকে টিকে থাকতে হয়। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে অনিয়মিত ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ইট শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে ঝুঁকি ও আর্থিক ক্ষতি; তবুও শিল্পটি তার শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর জীবিকা রক্ষার স্বার্থে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। ইট শিল্পের প্রধান কাঁচামাল মাটি। দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্য সংগঠনের পক্ষ থেকে নদী, নালা, খাল ও অন্যান্য জলাশয় সংস্কারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে, সরকারি রাজস্ব ও রয়্যালটি প্রদান সাপেক্ষে মাটি সংগ্রহের অনুমতি দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানানো হয়ে আসছে। অতীতে কোথাও কোথাও নদী-নালা সংস্কার করে মাটি কাটার অনুমতি দেওয়া হলেও বাস্তবে ইট শিল্প সেই মাটি পর্যাপ্ত পরিমাণে পায়নি। কিছু ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও সিন্ডিকেট মারফত মাটি অত্যন্ত উচ্চ মূল্যে সংগ্রহ করতে হয়েছে।
বর্তমানে পরিস্থিতি আরও জটিল। বৈধভাবে পরিচালিত ইটভাটাগুলির জন্য মাটি ও বালি সংগ্রহের প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন বা আদেশ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে আসন্ন সিজনে এই শিল্পের উৎপাদন শুরু করা অসম্ভব হবে। সরকারের গৃহহীন দের গৃহ প্রকল্পে কীভাবে ইট যোগাবে আমাদের জানা নেই। অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের জীবিকা এবং সরকারের রাজস্ব, উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে আমরা অর্থাৎ রাজ্য সংগঠনের প্রতিনিধিরা অর্থমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী ও পঞ্চায়েতমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। মন্ত্রীরা বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে আন্তরিকতা ও সক্রিয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। রাজ্য সংগঠন তাঁদের এই ইতিবাচক মনোভাবের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে এবং আশা করছি প্রশাসনিক পর্যায়ে দ্রুত কার্যকর সমাধানের পথ সুগম হবে।
একই সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি রাজস্ব প্রদান না করা কিংবা প্রয়োজনীয় কোনও বৈধ নথিপত্র না থাকা অবৈধ ইটভাটাগুলির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগকে রাজ্য সংগঠন স্বাগত জানিয়েছে। অবৈধ কার্যকলাপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি, কারণ অবৈধ ভাটাগুলি শুধু পরিবেশ ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার ক্ষতি করে না, বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনাকারী শিল্পোদ্যোগীদের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও অসম পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
তবে রাজ্য সংগঠনের পক্ষ থেকে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে, অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি বৈধ ইটভাটাগুলির সমস্যার প্রতিও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। যারা নিয়ম মেনে ব্যবসা করছেন, সরকারি রাজস্ব ও রয়্যালটি প্রদান করছেন এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি মেনে শিল্প পরিচালনা করছেন, তাঁদের জন্য কাঁচামাল সংগ্রহের একটি স্বচ্ছ, সহজ ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা সহ পরিবেশ দপ্তর এর ছাড়পত্র এর পুনর্নবীকরণ অবিলম্বে নিশ্চিত করা দরকার।
এই শিল্পটির সংগঠন চায় ন্যায্য সুযোগ, স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং বৈধভাবে কাজ করার অধিকার। সরকারের সহযোগিতা ও প্রশাসনের ইতিবাচক উদ্যোগের সমন্বয়ে এই শ্রমনির্ভর শিল্পকে রক্ষা করা সম্ভব বলেই আমরা বিশ্বাস করি।
ইট শিল্প টিকে থাকলে লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা সুরক্ষিত থাকবে, নির্মাণ অর্থনীতি সচল থাকবে এবং সরকারের রাজস্ব প্রবাহও অব্যাহত থাকবে। তাই বর্তমান সংকটকে কেবল একটি শিল্পের সমস্যা হিসেবে নয়, শ্রম, জীবিকা, রাজস্ব ও অর্থনীতির সম্মিলিত স্বার্থের প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করা সময়ের দাবি।