এই মুহূর্তে ক্রীড়া/অনুষ্ঠান অন্যান্য সাহিত্য সম্পাদকীয় নোটিশবোর্ড

E-Paper

দাসপুর থেকে লাদাখ: ৫৯ বছর বয়সে প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটারের বাইক অভিযানে দুবরাজপুরের প্রভাত ও কৈগেড়িয়ার অনুপের অনন্য নজির

Published on: August 8, 2026 । 8:40 AM

রবীন্দ্র কর্মকার ,স্থানীয় সংবাদ’, ঘাটাল: কথায় আছে, স্বপ্নের কোনো বয়স হয় না—এই কথাটিই যেন নতুন করে প্রমাণ করলেন দাসপুর-২ ব্লকের দুবরাজপুর গ্রামের ৬০ ছুঁইছুঁই প্রভাত বেরা। জীবনের একটি অন্যতম স্বপ্নকে সফল করতে সমবয়সী পিসতুতো ভাই অনুপ মাইতিকে সঙ্গে নিয়ে হোন্ডা সিবি ৩৫০ মোটরসাইকেলে চেপে প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটারের এক রোমাঞ্চকর অভিযানে পাড়ি দিলেন ভারতের অন্যতম দুর্গম ও মনোমুগ্ধকর ভ্রমণ গন্তব্য লাদাখে। ১০ জুলাই ভোর ৩টায় শুরু হওয়া এই যাত্রা, শেষ হয় ২৩ জুলাই সকালে। দীর্ঘ এই সফরে উত্তর ভারতের পাহাড়, তুষার, যুদ্ধস্মৃতি, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য—সব মিলিয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে আজীবনের এক সম্পদ।
প্রভাতবাবু পেশায় কেবিল অপারেটর। বাড়িতে স্ত্রী সুতপা, ছেলে সার্থক এবং বৌমা রাখী বাগ বেরা রয়েছেন। ছেলে বি.টেক ইঞ্জিনিয়ার, আসামে কর্মরত। এবং অনুপবাবু রূপোর ব্যবসায়ী। বাড়িতে স্ত্রী পুতুল ও ছেলে সিদ্ধান্ত মাইতি। রয়েছেন। সিদ্ধান্ত টিসিএস-এ চাকরি করেন। প্রভাতবাবু ও অনুপবাবু বলেন, বাড়ি থেকে হাল্কা আপত্তি সত্বেও আমরা জেদ নিয়েই বেরিয়ে পড়ি পোঁটলাপুঁটলি বেঁধে। বাইকে করে প্রথম দিনেই সন্ধ্যে ৭টা নাগাদ পৌঁছে যাই উত্তরপ্রদেশের ঐতিহাসিক শহর প্রয়াগরাজে। গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতীর মিলনস্থল ত্রিবেণী সঙ্গম দর্শনের পর পূর্ণ সেনাপতি নামে এক আত্মীয়ের বাড়িতে রাত কাটানো হয়। পরেরদিন গন্তব্য ছিল হরিয়ানার কর্নাল। স্থানীয় গুরুদুয়ারায় তাঁদের আন্তরিক আতিথেয়তা সত্যিই মুগ্ধ করে দেয় আমাদের। যে আতিথেয়তা আমরা কল্পনাও করিনি। এরপর শুরু হয় পাহাড়ি পথের আসল অভিযান। হিমাচল প্রদেশের কুল্লু ও মানালি পেরিয়ে পৌঁছাই বিশ্বের দীর্ঘতম হাইওয়ে টানেলগুলির অন্যতম অটল টানেল-এ। প্রায় ৯.০২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই টানেল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ হাজার ফুট উচ্চতায় নির্মিত এবং লাহৌল-স্পিতিকে সারা বছর দেশের সঙ্গে সংযুক্ত রাখে। টানেল পার হওয়ার পর চোখের সামনে ধরা দেয় হিমালয়ের অপরূপ রূপ, যা আমাদের বহুদিনের স্বপ্নপূরণ করেছে।
কেলংয়ে রাত কাটিয়ে পরদিন শুরু হয় সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। কেলং থেকে সুরচু হয়ে লে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটারের দীর্ঘ পথে কার্যত কোনও পেট্রল পাম্প নেই। দুর্গম পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে বিকেলে তাঁরা পৌঁছে যান লাদাখের রাজধানী লে-তে। প্রায় ১১,৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ওই শহরে অক্সিজেনের স্বল্পতা অনুভব করা স্বাভাবিক। লাদাখ ঘুরে দেখার জন্য মাথাপিছু ছ’শো টাকার অনলাইন পারমিট কাটিয়ে তাঁরা রওনা দেন বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত উচ্চভূমির হ্রদ প্যাংগং লেক-এর পথে। সেই পথে অপেক্ষা করছিল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৭,৫৮৬ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত চাংলা পাস—পিচ রাস্তার দু’ধারে পাঁচ ফুটেরও বেশি উঁচু বরফের দেওয়াল দাঁড়িয়ে আছে, মাথার ওপর স্নোফল—মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় ৩৬–৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের গরম থেকে হিমশীতল বরফের দেশে পৌঁছে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁদের কাছে ছিল অবর্ণনীয়। একটা আলাদাই অনুভূতি।
লাদাখ দর্শনের পর ফেরার পথে তাঁরা যান কারগিলে। ১৯৯৯ সালের ভারত-পাকিস্তান কারগিল যুদ্ধের স্মৃতি বহনকারী ওই অঞ্চল ছিল তাঁদের কাছে এক অন্য অনুভূতির বিষয়। টিভিতে কারগিল যুদ্ধে ভারতীয় সেনাদের অনেক গৌরব কাহিনী শুনেছিলেন তাঁরা। সেই কারগিলে তাঁদের দাঁড়িয়ে একটা গর্ব অনুভূত হচ্ছিল। এরপর শুরু হয় ভয়ঙ্কর অথচ রোমাঞ্চকর জোজিলা পাস অতিক্রমের অভিযান। সংকীর্ণ সরু রাস্তা, গভীর খাদ এবং প্রতিকূল আবহাওয়া, সব মিলিয়ে ওই পথ ভারতের অন্যতম চ্যালেঞ্জিং পর্বতপথ হিসেবে পরিচিত।
জোজিলা পার হয়ে তাঁরা পৌঁছান সোনমার্গে, যা “কাশ্মীরের সুইজারল্যান্ড” নামে পরিচিত। ঘোড়ায় চড়ে গ্লেসিয়ার দেখা, তুষারে ঢাকা উপত্যকা ও সিনেমার শুটিং-স্পট, গুলমার্গ জিরো পয়েন্ট এইসব স্থান ঘুরে দেখার পর গন্তব্য হয় ওখান থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে শ্রীনগর। প্রভাতবাবুর এক প্রতিবেশী সুশান্ত সানকি যিনি কর্মসূত্রে শ্রীনগরে থাকেন, তাঁর কাছে আশ্রয় নিয়ে ঐতিহাসিক লালচক, বিখ্যাত ডাল লেক দেখে তাঁরা মুগ্ধ হয়ে যান। সময়ের অভাবে প্রায় দু’হাজার বছরের প্রাচীন শঙ্করাচার্য মন্দিরে যেতে না পারলেও কাশ্মীরের সৌন্দর্য তাঁদের মনে আলাদাই অনুভূতি এনে দিয়েছে যা তাঁরা সারাজীবন মনে রাখবেন।
পরের দিন ওখান থেকে বেরিয়ে পাঠানকোট হয়ে অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির যাওয়া হয়। ওখানে প্রভাতবাবুর ছেলের শ্বশুরমশাইয়ের ব্যবসায়িক স্থান থাকায় সেখানেও সমাদরের অভাব ছিল না। বিশ্বের বৃহত্তম কমিউনিটি কিচেন ‘লঙ্গর’-এর জন্যও পরিচিত ওই পবিত্র শিখ তীর্থে প্রায় চার ঘণ্টা ঘুরে দেখতে সময় লাগল। এরপর ওয়াঘা সীমান্ত, নিউ দিল্লি, করোলবাগ হয়ে পরেরদিন মথুরা রোড ধরে পৌঁছানো হয় বৃন্দাবনে। এক বন্ধু গোবিন্দ কাপাসের সহযোগিতায় বাঁকে বিহারী, প্রেম মন্দির, নিধিবনসহ একাধিক ঐতিহাসিক মন্দির, যমুনা ঘাটে সন্ধ্যারতি দর্শনের পাশাপাশি ঘটে এক মজার ঘটনা—এক দুষ্টু বাঁদর প্রভাতবাবুর চশমা ছিনিয়ে নেয়। শেষ পর্যন্ত দুটি ফ্রুটির বিনিময়ে অনেক সাধ্যসাধনার পর চশমা উদ্ধার হয়, যা পুরো সফরের সবচেয়ে মজার ও হাস্যরসাত্মক স্মৃতি হয়ে রইল বলে প্রভাতবাবু বলেন। আশ্রমে রাত কাটিয়ে পরেরদিন ফেরার পালা।
২৩ জুলাই সকালে বাড়ি ফিরে ভারতের ম্যাপে নিজের যাত্রাপথ দেখে অবাক হয়ে যান তাঁরা। বয়স যে কেবল একটি সংখ্যা, আর ইচ্ছাশক্তিই যে মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তা প্রমাণ করে দেখালেন তাঁরা। তাঁদের পরবর্তী স্বপ্ন— ভারতের দক্ষিণ প্রান্ত কন্যাকুমারী পর্যন্ত আরেকটি দীর্ঘ বাইক অভিযান।

কেয়া মণ্ডল চৌধুরী

আমার শিকড় ঘাটালে, আর আমার লেখার মূল বিষয় এখানকার সাধারণ মানুষ। তাঁদের জীবনের না-বলা কথাগুলো সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমার প্রধান লক্ষ্য। আপনার আশেপাশে ঘটে যাওয়া এলাকার যেকোনো খবর জানাতে সরাসরি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করুন ৮৯০০০২০০০১ নম্বরে।