এই মুহূর্তে ক্রীড়া/অনুষ্ঠান অন্যান্য সাহিত্য সম্পাদকীয় নোটিশবোর্ড

E-Paper

সন্তান দত্তক নিতে চান? জেনে নিন নতুন নিয়ম ও সঠিক পদ্ধতি

Published on: December 17, 2025 । 8:49 AM
কাজলকান্তি কর্মকার
কাজলকান্তি কর্মকার
প্রতিবেদক রাজ্যস্তরের প্রথম শ্রেণির বাংলা দৈনিক সংবাদপত্রের সাংবাদিক
📞 +919933066200 WhatsApp

•কাজলকান্তি কর্মকার, সাংবাদিক[M:9933066200]: দাসপুর থানার বৈকুণ্ঠপুরের সুমিত পাইন এবং মণিকা পাইনের দুটি পুত্র সন্তান রয়েছে।  তবু কন্যা সন্তান লালন-পালন করার বাসনা হওয়ায় ডিসেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুক শহরের এক নার্সিং হোম থেকে ১০-১২ দিনের একটি কন্যা সন্তান ‘জোগাড়’ করে বাড়িতে রেখেছিলেন। পুলিশ ও চাইল্ডলাইন জানতে পেরে ১৬ ডিসেম্বর(২০২৫) রাতে শিশুটিকে উদ্ধার করে নিয়ে চলে যায়। দম্পতি কান্নায় ভেঙে পড়েন। পুলিশ ও চাইল্ডলাইন সূত্রে জানা গিয়েছে, পুরুলিয়া জেলার পুঞ্চা থানার রাসুদিহি গ্রামের মিত্র দম্পতি দুজনেই চাকরি করেন। তাঁদের তিনটি কন্যা সন্তান রয়েছে। চতুর্থ বারের ওই সিজারিয়ান ডেলিভারিটি তমলুকের ওই নার্সিংহোমে হয়। এবারেও কন্যা সন্তান হওয়ায় তারা সন্তানটি বাড়ি নিয়ে যেতে রাজি হননি। তখনই নার্সিংহোম বৈকুণ্ঠপুরের পাইন দম্পতিকে খবর দিয়ে সদ্যোজাতটিকে তুলে দেয়। সুমিত-মণিকা  জানান, তাঁরা যাতে শিশুটিকে নিজেদের কন্যা সন্তান হিসেবে অধিকার নিয়ে বড় করতে পারেন, নিজেদের কাছে রাখতে পারেন তার জন্য মিত্র দম্পতি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ডিসেম্বরের মধ্যেই আদালতে গিয়ে ‘বৈধ’ কাগজপত্র করে দেবেন [ঘটনাটি জানতে নীচের ভিডিওটি দেখতে পারেন]। 
ওই ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে। প্রশাসন জানতে পারলেই সন্তানকে উদ্ধার করে নিয়ে চলে যায়। জেনে রাখুন বর্তমানে ওই ভাবে সন্তান দত্তক নেওয়া যায় না। নিঃসন্তান দম্পতিদের মুখে হাসি ফোটাতে বা অনাথ শিশুদের একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ দিতে সন্তান দত্তক নেওয়া একটি মহৎ উদ্যোগ। তবে ভারতে দত্তক নেওয়ার পদ্ধতিটি অত্যন্ত কঠোর এবং সম্পূর্ণভাবে আইনি পথে হয়। কেউ যদি সন্তান দত্তক নিতে চান বা কোনও বিশেষ কারণে নিজের সন্তানকে অন্য কাউকে দিতে চান, তবে ওই ভাবে  ভুল পথে পা বাড়াবেন না। জেনে নিন সরকারি সঠিক নিয়ম। কারণ, একটি শিশুকে নতুন জীবন দেওয়া এবং নিজের ঘর আলো করে তোলা তথা দত্তক নেওয়ার বিষয়টি যতটা আবেগপ্রবণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ এর আইনি সঠিকতা।
কাদের কাছ থেকে সন্তান দত্তক পাওয়া যায়?
ভারতে শুধুমাত্র কারাই (CARA=Central Adoption Resource Authority) সন্তান দত্তক দিতে পারে। আর নিয়ম অনুযায়ী, দত্তক নেওয়ার প্রক্রিয়ায় যদি কোনও ফাঁকফোকর রয়ে যায় তাহলে বড় বিপদে পড়তে হতে পারে। প্রথমে স্বামী-স্ত্রী বা নিজের কত বয়স থাকলে, একক নারী বা একক স্ত্রী কোন লিঙ্গের শিশুকে  দত্তক নিতে পারবেন সেটা আগে জেনে নেওয়া দরকার।
•শিশু কন্যা, নাকি শিশু পুত্র? একক নারী (Single Woman) যেকোনও লিঙ্গের (শিশুপুত্র বা শিশু কন্যা) শিশুকে দত্তক নিতে পারেন। কিন্তু একজন একক পুরুষ (Single Man) কেবল মাত্র শিশুপুত্রকে দত্তক নিতে পারবেন, শিশু কন্যাকে নয়।
•দম্পতির বয়স: ভারতের কারার নিয়ম অনুযায়ী দম্পতির বয়স এবং বাচ্চার বয়সের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ব্যবধান থাকা বাধ্যতামূলক। এই নিয়মটি করা হয়েছে যাতে মা-বাবা এবং সন্তানের মধ্যে একটি স্বাভাবিক বয়সের পার্থক্য বজায় থাকে এবং মা-বাবা যেন বাচ্চার লালন-পালন করার মতো শারীরিক ও মানসিকভাবে সক্ষম থাকেন। দত্তক নিতে ইচ্ছুক মা-বাবা এবং সন্তানের মধ্যে বয়সের পার্থক্য অন্তত ২৫ বছর হতে হবে। অর্থাৎ, বাচ্চার বয়সের চেয়ে মা বা বাবার বয়স অন্তত ২৫ বছর বেশি হতে হবে। দম্পতি হিসেবে দত্তক নিতে চাইলে অন্তত ২ বছরের স্থিতিশীল বিবাহিত জীবন থাকা প্রয়োজন। নিয়ম অনুযায়ী যদি ২ বছর বয়সী পর্যন্ত বাচ্চা নিতে চান তাহলে বাবা ও মায়ের বয়সের যোগফল ৮৫ বছরের বেশি হওয়া যাবে না। একক বাবা/মায়ের ক্ষেত্রে ৪৫বছরের বেশি হওয়া চলবে না। ২ বছর থেকে ৪ বছরের বাচ্চা নিতে হলে স্বামী-স্ত্রীর বয়সের যোগফল ৯০ বছরের বেশি হওয়া যাবে না। একক পেরেন্টের ক্ষেত্রে ৫০ বছরের বেশি হওয়া যাবে না। ৪ থেকে ৮ বছর বয়সের মধ্যে বাচ্চা নিতে হলে বাবা মায়ের বয়েসের যোগফল ১০০ বছরের মধ্যে হতে হবে, সিঙ্গেলের ক্ষেত্রে ৫৫ বছরের বেশি হওয়া যাবে না। ৮ থেকে ১৮ বছরের বয়সের বাচ্চা নিতে চাইলে স্বামী-স্ত্রীর বয়সের যোগফল ১১০ বছর বা তার কম হতে হবে এবং একক বাবা বা মায়ের ক্ষেত্রে ৬০ বছরের বেশি বয়স হওয়া চলবে না। তবে  যদি কোনও দম্পতি নিকট আত্মীয়ের সন্তান বা সৎ সন্তান দত্তক নিতে চান, সেক্ষেত্রে এই বয়সের ঊর্ধ্বসীমার নিয়মটি অনেক ক্ষেত্রে শিথিল করা হয়।
•কেন এই বয়সের গ্যাপ রাখা হয়? মা-বাবা যেন বাচ্চার প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত তার দায়িত্ব নিতে পারেন। বয়সের গ্যাপ স্বাভাবিক থাকলে মা-বাবা ও সন্তানের মধ্যে বোঝাপড়া ভালো হয়। শিশু লালন-পালনের জন্য যে শক্তির প্রয়োজন, তা যেন মা-বাবার থাকে।
•যেটা জানা জরুরি: সন্তান দত্তক নেওয়ার জন্য কোনও ‘ইনফার্টিলিটি সার্টিফিকেট’ বা বন্ধ্যাত্বের প্রমাণপত্রের প্রয়োজন হয় না। কেবল বাচ্চার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করাই এই আইনের একমাত্র লক্ষ্য।
কীভাবে দত্তক নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় সেটা জেনে রাখুন—
•রেজিস্ট্রেশন: সন্তান দত্তক নিতে হলে রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক। বর্তমানে সন্তান দত্তক নেওয়ার একমাত্র বৈধ পথ হলো কারা’র নির্দিষ্ট পোর্টালে (www.cara.nic.in) নাম নথিভুক্ত করা। কোনও ব্যক্তি, নার্সিংহোম বা সংস্থার কাছ থেকে সরাসরি বাচ্চা নেওয়া বা দেওয়া এখন আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। অবিবাহিত, বিবাহিত, বিবাহবিচ্ছিন্ন বা বিধবা—যেকোনও ব্যক্তিই নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে আবেদনের যোগ্য।
•হোম স্টাডি রিপোর্ট: এর মাধ্যমে আপনার প্রস্তুতি যাচাই শুরু করা হবে। দত্তক নেওয়ার আবেদনের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হল হোম স্টাডি। বাচ্চাটি আপনার বাড়িতে এসে সুখী ও নিরাপদ থাকবে কিনা তা নিশ্চিত করার জন্য সরকার নির্দিষ্ট একজন পেশাদার সমাজকর্মী আপনার বাড়ি পরিদর্শন করবেন। আপনি কেন বাচ্চা দত্তক নিতে চান? বড় কোনও শিশু বা বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুকে গ্রহণ করার মানসিকতা আপনার আছে কিনা। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক কেমন এবং কোনও বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আপনারা কতটা ঐক্যবদ্ধ। বাড়িতে থাকা দাদু-ঠাকুমা বা অন্যান্য সদস্যরা এই নতুন সদস্যকে মেনে নিতে প্রস্তুত কিনা। যদি ভবিষ্যতে মা-বাবার কোনও দুর্ঘটনা ঘটে, তবে বাচ্চার দায়িত্ব কে নেবে তার পরিকল্পনা আগে থেকেই থাকতে হবে। আপনার আভিজাত্য নয়, আপনার আর্থিক স্বচ্ছলতা জরুরি। কারা স্পষ্ট জানিয়েছে, বিগত কয়েক বছরের ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন, ব্যাংক স্টেটমেন্ট এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব দিতে হবে। ঋণের বোঝাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হয়। মা-বাবা দুজনেই শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ কিনা, তার ডাক্তারি শংসাপত্র প্রয়োজন। কোনও জটিল রোগ বা মানসিক চিকিৎসার ইতিহাস থাকলে তা জানানো বাধ্যতামূলক। আবেদনের পর সরকার নিযুক্ত একজন সোশ্যাল ওয়ার্কার আপনার বাড়িতে আসবেন।
•প্রাক-দত্তক কাউন্সেলিং: দত্তক নেওয়ার আগে দম্পতিকে বিশেষ প্রশিক্ষণ বা কাউন্সেলিং দেওয়া হয় যাতে তারা নতুন বাচ্চার মানসিকতা বুঝতে পারেন।
•মেডিক্যাল রিপোর্ট: বাচ্চার বর্তমান শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসা সংক্রান্ত সব নথি আবেদনকারী দম্পতিকে বিস্তারিত জানানো হয়। কোনও লুকোছাপা নয়, কারার নিয়ম অনুযায়ী, সোশ্যাল ওয়ার্কার বা সংস্থাকে কোনও ভুল তথ্য দিলে আবেদন বাতিল হতে পারে।
•আইনি চূড়ান্ত ধাপ: সব প্রক্রিয়া শেষে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট  চূড়ান্ত দত্তক আদেশ জারি করেন। এর পরেই ওই শিশুটি আইনত আপনার সন্তান হিসেবে গণ্য হবে।
•কেউ যদি সন্তান দত্তক দিতে চান, তবে কী করণীয়? সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বিষয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই অভাবের কারণে বা লোকলজ্জার ভয়ে সরাসরি কাউকে বাচ্চা দিয়ে দেন। এটি ভারতে সম্পূর্ণ বেআইনি। অনেক সময় দারিদ্রতা বা বিশেষ পরিস্থিতির কারণে কোনও দম্পতি নিজের সন্তানকে অন্য কাউকে দিতে চান। মনে রাখবেন, সরাসরি অন্য দম্পতির হাতে সন্তান তুলে দেওয়া ভারতে নিষিদ্ধ।
•আত্মীয়র মধ্যে দত্তক: যদি আপনি নিজের কোনও নিকট আত্মীয়কে (যেমন ভাই বা বোন) বাচ্চা দিতে চান, তবে সরাসরি রিলেটিভস অ্যাডপশন(Relative Adoption) ক্যাটাগরিতে আবেদন করতে হবে। এক্ষেত্রে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের  অনুমতি এবং প্রি-অ্যাপ্রুভাল লেটার প্রয়োজন।
•আত্মীয় ছাড়া অন্য কাউকে দিতে চাইলে: যদি আপনি কোনও পরিচিত বা অপরিচিত ব্যক্তিকে বাচ্চা দিতে চান, তবে সরাসরি তা করা সম্ভব নয়। আপনাকে আপনার নিকটস্থ চাইল ওয়েলফেয়ার কমিটি (Child Welfare Committee) বা সরকারি অনুমোদিত সংস্থার কাছে যেতে হবে। সেখানে নিয়ম মেনে সন্তানকে সমর্পণ করতে হয়। এরপর সরকার সেই বাচ্চার জন্য উপযুক্ত পরিবারের খোঁজ করে। সেখানে বাচ্চাটিকে সমর্পণ করলে সরকার তাকে ‘আইনত দত্তক যোগ্য’ ঘোষণা করবে এবং একটি ভালো পরিবার খুঁজে দেবে।


 

নিউজ ডেস্ক

‘স্থানীয় সংবাদ’ •ঘাটাল •পশ্চিম মেদিনীপুর-৭২১২১২ •ইমেল: [email protected] •হোয়াটসঅ্যাপ: 9933998177/9732738015/9932953367/ 9434243732 আমাদের এই নিউজ পোর্টালটি ছাড়াও ‘স্থানীয় সংবাদ’ নামে একটি সংবাদপত্র, MyGhatal মোবাইল অ্যাপ এবং https://www.youtube.com/SthaniyaSambad ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে।