এই মুহূর্তেক্রীড়া/অনুষ্ঠানঅন্যান্যসাহিত্যসম্পাদকীয়নোটিশবোর্ড

E-Paper

পেশা নয়, নেশা। এই নেশাই বারবার নিয়ে গেছে মৃত্যুর দোরগোড়ায়, তবুও হাল ছাড়েননি মলয় ঘোষ

Published on: October 5, 2026 । 9:51 AM

তৃপ্তি পাল কর্মকার, স্থানীয় সংবাদ, ঘাটাল:  পেশা নয় নেশা। এই নেশাই তাঁকে বারবার দিয়েছে মৃত্যুর ঝুঁকি। একবার নয়, দুবার নয়, মোট পঁচিশবার ছোবল দিয়েছে বিষধর সাপ। এভিএস নিতে হয়েছে ষোলোবার। তবুও এই নেশা থেকে সরে আসতে পারেননি মানুষটি।  তিনি আর কেউ নন, ঘাটাল মহকুমার মানুষ সাপের আতঙ্কে বিপদে পড়লে দিন রাত উপেক্ষা করে যে মানুষটি ছুটে যান পরিত্রাতা হয়ে সেই মলয় ঘোষের কথাই বলছি।
বছর পঁয়তাল্লিশের মলয় ঘোষের বাড়ি চন্দ্রকোণা থানার পুড়শুড়িতে। পলিটেকনিক ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ, পেশায় কাঠ ব্যবসায়ী মলয়বাবু কাঠের ব্যবসার সূত্রে বনদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। ছিল বন্যপ্রাণীদের প্রতি টান। সেই নেশা থেকেই ২০০০ সালে খড়্গপুর ওয়াইল্ড লাইফ ট্রেনার জয়ন্ত জানার কাছে ট্রেনিং নেন। ওয়াইল্ড লাইফ রেসকিউয়ের হাতে কলমে ট্রেনিং নেন খড়্গপুরের ওয়াইল্ড লাইফের কৌস্তুভ চক্রবর্তীর কাছ থেকে। এরপর শুরু হয় পথচলা।

২০২০ সালের  ঘাটাল মহকুমার সামাজিক পরিকাঠামো এমন ছিল, সে সময় বন্যপ্রাণীদের নিধন করা হত প্রচুর। বিশেষ করে সাপ দেখলেই মানুষ পিটিয়ে মেরে ফেলত। ওই সময় মানুষ প্রচুর পরিমাণে যে নিধনযজ্ঞটি করছে তা হল শঙ্খিনী নিধন। তাই আজ ঘাটাল মহকুমায় কালাচ চন্দ্রবোড়ার বাড়বাড়ন্ত। যাইহোক ২০০০ সাল থেকে বাড়ির আশেপাশে সাপ, পাখি, হনুমান সহ বিভিন্ন প্রাণীদের জীবনের ঝুঁকি থাকলে মলয়বাবু বেরিয়ে পড়তেন জনরোষ থেকে প্রাণীটিকে বাঁচাতে। এরপর এলাকায় উদ্ধারকাজের কথা ছড়িয়ে পড়লে মানুষ আর বন্যপ্রাণীদের মারত না, খবর দিত মলয়বাবুকে। তারপর আসে সোশ্যাল মিডিয়ার বাড়বাড়ন্ত। মানুষ ক্রমশ সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্ত হয়ে পড়তে শুরু করে। একটা পরিবারের কমবেশি সবাই সোশ্যাল মিডিয়ার খবরের চ্যানেলগুলো ফলো করেন। স্থানীয় সংবাদের ডিজিটাল  মিডিয়া ধারাবাহিক ভাবে মলয়বাবুর সাপ ধরা এবং  বিভিন্ন বন্যপ্রাণীদের উদ্ধারের রোমহর্ষক ভিডিওগুলির কভারেজ দিতে থাকেন। সমগ্র ঘাটাল মহকুমায় বিপুল জনপ্রিয়তা তৈরি হয় মলয় ঘোষের। এই জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তৈরি হয় মানুষের বদ অভ্যাস। বাড়িতে সাপ ঢুকলে কেউ আর আগের মত সাপটিকে তাড়ানোর চেষ্টা বা বের করার চেষ্টা না করেই খবর দিতে শুরু করে বনদপ্তরের ওয়াইল্ড লাইফ রিকোভারি টিমে। মানুষের মনে  বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয়, আছে তো মলয় ঘোষ, ধরে নিয়ে যাবে সাপ!
স্বাভাবিকভাবেই এরপর বাড়তে থাকে মলয়বাবুর ব্যস্ততা। রাত নেই দিন নেই ফোন আসতে শুরু করে। কার ঘরের মশারির মধ্যে সাপ, কার বিছানায় সাপ, কার বাথরুমে সাপ, কার ঘরে গন্ধগোকুল বসে আছে, ফোন আসতেই থাকে।
রাত একটা দেড়টার ফোনে মানুষের ডাকে ছুটে যান কেন, রাস্তায় তো নানা বিপদ পদে পদে? এ কথার উত্তরে মলয়বাবু বলেন, মানুষ বিপদে পড়লে আমি নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারি না। ভগবানের কৃপায়  আজ পর্যন্ত রাতে আমার কোনও বিপদ হয়নি রাস্তায়। তবে মলয়বাবুর স্ত্রী অপর্ণা ঘোষ, দুই মেয়ে মল্লিকা ও সুদেষ্ণা রাতে বেরিয়ে যাওয়া পছন্দ করত না। কিন্তু ফোনের ওপারে থাকা মানুষের অসহায়তা বা কান্না যখন তাদের কানে আসে তারাও আর আপত্তি করতে পারে না।
ঘাটাল মহকুমায় আটানব্বই শতাংশ মানুষ মলয়বাবুর কাজের প্রশংসা করলেও, ২ শতাংশ মানুষ মলয়বাবুর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অনেকে সমালোচনা করে বলেন, যে রেসকিউয়ারকে পঁচিশবার সাপে কামড়ায় সে কি আদৌ রেসকিউয়ার?
তাদের সমালোচনার উত্তরে মলয়বাবুর জবাব, আমার রেসকিউয়ের ভুলে একবারও বিপদ হয়নি, হয়েছে মানুষের ভুলে, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কারণে। কাজেই সমালোচনা যারা করে করুক, তাদেরকে জবাব দেবার দায়বদ্ধতা আমার নেই।
৯ সেপ্টেম্বর পথ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে চন্দ্রবোড়ার ছোবল খেয়েছিলেন খড়ারের দলপতিপুরে। মলয়বাবু স্বীকার  করেছেন এটিই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বাইট ছিল।  কৌটোর মধ্যে সাপটি রেসকিউ করে ফেরার সময় রাস্তায় স্লিপ করে উল্টে যায় বাইক, কৌটোর মুখ খুলে সাপটি বেরিয়ে কামড়ে দেয় হাতে। শিরায় কামড় পড়েছে বুঝতে পেরেই মলয়বাবু সঙ্গে সঙ্গে বীরসিংহ হাসপাতালে গিয়ে কুড়িটি এভিএস নেন, তারপর তাঁকে ঘাটাল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েকদিন যমে মানুষে টানাটানির পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন মলয় ঘোষ। বাড়ি ফিরেই আবার নেশার টানে বেড়িয়ে পড়েছেন। এখনও ওষুধ চলছে, বাইক দুর্ঘটনার কারণে হাতেও রয়েছে চোট। তার চিকিৎসাও  চলছে। তবে মনে তো আর ফাটল ধরেনি! তাই দমিয়ে রাখা যায়নি মলয়বাবুকে। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফেরার পথে দুটি কচ্ছপ জলাশয়ে ছেড়ে আবার ফেরেন উদ্ধারকারীর জীবনে। কতদিন করবেন একাজ? মলয়বাবু বলেন, যতদিন সুস্থ থাকব বন্যপ্রাণীদের উদ্ধার করে যাব। হয়তো বিপদ আছে, ঝুঁকি আছে, তবুও প্রকৃতির জীব বিপদে থাকবে আমি নিশ্চিন্তে থাকব, এটা আমি পারব না।

তৃপ্তি পাল কর্মকার

আমার প্রতিবেদনের সব কিছু আগ্রহ, উৎসাহ ঘাটাল মহকুমাকে ঘিরে... •ইমেল: [email protected] •মো: 9933066200 •ফেসবুক: https://www.facebook.com/triptighatal •মোবাইল অ্যাপ: https://play.google.com/store/apps/details?id=com.myghatal.eportal&hl=en ইউটিউব: https://www.youtube.com/c/SthaniyaSambad