এই মুহূর্তে ক্রীড়া/অনুষ্ঠান অন্যান্য সাহিত্য সম্পাদকীয় নোটিশবোর্ড

E-Paper

সব চাপা পড়ে যায়, শুধু থেকে যায় হাহাকার

Published on: February 12, 2026 । 9:46 AM
দেবপ্রসাদ পাঠক বন্দ্যোপাধ্যায়
দেবপ্রসাদ পাঠক বন্দ্যোপাধ্যায়
ঘাটাল মহকুমা আদালতের একজন স্বনামধন্য বরিষ্ঠ আইনজীবী। দিনের অধিকাংশ সময় আইনের জটিল যুক্তি-তর্ক এবং পেশাগত পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও, শত ব্যস্ততার মাঝে নিজের মৌলিক চিন্তাভাবনা ও সামাজিক চিত্র নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে কলম ধরতে ভালোবাসেন।
📞 +919433256773 WhatsApp

দেবপ্রসাদ পাঠক বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রবীণ আইনজীবী, ঘাটাল আদালত: সভ্যতার পলি জমতে জমতে যেমন নদীর গভীরতা কমে, তেমনই আমাদের স্মৃতি আর ক্ষোভের ওপর দুর্নীতির এক কালো আস্তরণ পড়ে গেছে। আজ সব চাপা পড়ে গেছে সুপ্রিম অপটিক্সের রহস্যময় কাঁচের আড়ালে। সেই যে রাত দুটো পর্যন্ত ফোনে অভয়া খুনের তদারকি চলছিল, সেই কণ্ঠস্বর আজ জনমতের ভিড়ে হারিয়ে গেছে। এমনকি কালীঘাটের কাকুর সেই পরিচিত গলার আওয়াজও আজ চিরতরে নিস্তব্ধ। মানুষের অঙ্গ নিয়ে কারবার, লাশের নীলছবি কিংবা মারণ জাল ওষুধের স্তূপ— সবটাই এক অদৃশ্য ক্ষমতার জাদুমন্ত্রে এখন বিস্মৃতির অতলে।
চব্বিশের অগস্টের সেই হাড়হিম করা আর্তনাদ আজ আর শোনা যায় না। রাজ্য জুড়ে যে অসংখ্য ‘আরজিকর’ ঘটে গেল, তাঁদের বিচারহীনতার যন্ত্রণা আজ ফিকে হয়ে আসছে। ল কলেজের তথাকথিত সুশাসনের চাদরে ঢাকা পড়েছে সেইসব লাঞ্ছিতাদের গল্প, যারা কেবল নারী হওয়ার অপরাধে শাসকের লালসার শিকার হয়েছে। কামদুনি থেকে মদ্যমগ্রাম, কিংবা ভাতার থেকে মির্জাপুর— যোনির গভীরে লোহার রড নিয়ে যারা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিল আবাস যোজনার কিস্তির বদলে, তাঁদের সেই বীভৎস লড়াই আজ কেবলই পুরনো নথির অংশ। কৃষকের গলায় দড়ি পড়ার কারণ হিসেবে রয়ে গেছে ভেজাল সার আর বিদ্যুৎ দপ্তরের সীমাহীন লুণ্ঠন। বর্ষার জমা জল আর বিদ্যুতের নগ্ন তার মিলে যে লাশের মিছিল তৈরি করে, তা যেন এক বার্ষিক নিয়মে পরিণত হয়েছে।
উত্তরের পাহাড় থেকে দক্ষিণের সমুদ্রতীর— বঞ্চনার ছবিটা একই। পাহাড়ের অবৈধ নির্মাণ আর হড়পা বানে ভেসে যাওয়া মালবাজারের আটটা প্রাণ আজ ইতিহাসের ধূসর পাতা। হলং অতিথিনিবাসের ঐতিহ্য পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, যেমন ছাই হয়ে গেছে লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ। সাড়ে আট হাজার স্কুল বন্ধ হওয়ার হাহাকার কিংবা রাজপথে বসে থাকা যোগ্য শিক্ষকদের চোখের জল আজ রিল-সংস্কৃতির ভিড়ে অপ্রাসঙ্গিক। শিক্ষাক্ষেত্রে জাল ডিগ্রিধারীদের দাপট আর নেতাজী ইন্ডোরে সেই প্রহসনমূলক নিয়োগপত্র বিলির কমেডি— সবই আজ বিস্মৃতির অতলে তলায়।
সন্দেশখালির লোনা জলে চাষের জমি হারানো মানুষের হাহাকার কিংবা এগরা-দত্তপুকুরের বাজি কারখানায় উড়ে যাওয়া ৫৭টি নিথর দেহ আজ আর আমাদের বিবেককে দংশন করে না। ডিয়ার লটারির নেশায় সর্বস্বান্ত হওয়া মানুষের আর্তনাদ চাপা পড়ে যায় সরকারি অনুদানে পুজো আর উৎসবের উন্মাদনায়। গরু, কয়লা আর বালিপাচারের প্রাগৈতিহাসিক বিষাক্ত স্রোতে আজ ভেসে যাচ্ছে বরুণ বিশ্বাস, আনিস খান বা মৈদুলদের আত্মত্যাগ। ঘাটালে ঝুমি নদীর গর্ভে এখন জলের বদলে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে বালির টিলা আর ঘাসের জঙ্গল। নদীকে বাঁচানোর বদলে মৃতপ্রায় নদীর ওপর গরু চরা আজ প্রশাসনিক ব্যর্থতার এক জলজ্যান্ত নিদর্শন। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান আজ কেবল নির্বাচনী ব্যঙ্গচিত্র। আসন্ন ছাব্বিশের ভোটের ঢাক বাজছে, আইপ্যাকের চশমা চোখে দিয়ে কিংবা মুখোশ পরে আবারও হয়তো কেউ গাইতে আসবে— ‘আয় ভোটার আয়’। কিন্তু এই সব ধামাচাপা দেওয়া মৃতদেহের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে গণতন্ত্র কি সত্যিই হাসতে পারে?

নিউজ ডেস্ক

‘স্থানীয় সংবাদ’ •ঘাটাল •পশ্চিম মেদিনীপুর-৭২১২১২ •ইমেল: [email protected] •হোয়াটসঅ্যাপ: 9933998177/9732738015/9932953367/ 9434243732 আমাদের এই নিউজ পোর্টালটি ছাড়াও ‘স্থানীয় সংবাদ’ নামে একটি সংবাদপত্র, MyGhatal মোবাইল অ্যাপ এবং https://www.youtube.com/SthaniyaSambad ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে।