জগন্নাথ রায় [সহ শিক্ষক, হেড়োভাঙ্গা বিদ্যাসাগর বিদ্যামন্দির, ঝারখালী, দক্ষিণ ২৪ পরগণা | দাসপুরের আজুড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা]: আমরা এ কোন শিক্ষায় শিক্ষিত করছি আজকের ছাত্র সমাজকে? শেষে কিনা প্রধান শিক্ষককে বেধড়ক মার খেতে হল নিজেরই স্কুলের ছাত্রদের হাতে। তাও শিক্ষক দিবস উপলক্ষ্যে সামান্য মাংস খেতে না পাওয়াকে কেন্দ্র করে? ৮ সেপ্টেম্বর জলপাইগুড়ি জেলার একটি স্কুলে প্রধানশিক্ষক ধর্মচাঁদ বারুইকে তাড়া করে মারধর করে রক্তাক্ত করার ঘটনাটি ইতিমধ্যে প্রায় সবাইই জেনে গেছেন। কিন্তু একটা কথা ভেবে দেখেছেন কি— ঘটনাটি শুধু একজন প্রধানশিক্ষকের ওপর হামলার ঘটনা নয়, এই ঘটনা একেবারে দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে দিয়েছে দেশের মেরুদণ্ডকে। এই ঘটনা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, মূল্যবোধ এবং ছাত্রসমাজের ভবিষ্যৎ আজ কোন দিকে এগোচ্ছে তা নিয়ে এক গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। আজ এই দৃশ্য দেখার পর একজন শিক্ষক হিসাবে যতটা অপমানিত বোধ করছি তার থেকে ছাত্র হিসাবে চরম লজ্জা বোধ করছি। একজন শিক্ষক শুধুমাত্র শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না। তিনি সমাজ গড়ার কারিগর, আগামী প্রজন্মের পথপ্রদর্শক। সেই শিক্ষককেই যদি ছাত্রদের হাতে কিল-ঘুষি, লাথি খেয়ে রক্তাক্ত হতে হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—আমরা আমাদের সন্তানদের কী শিক্ষা দিচ্ছি?
সামান্য খাওয়াদাওয়া নিয়ে অভিমান, ক্ষোভ বা প্রতিবাদ হতে পারে। কিন্তু সেই প্রতিবাদ যখন একজন শিক্ষকের গায়ে হাত তোলার পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন তা আর নিছক ছাত্রদের দুষ্টুমি বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার বিষয় নয়। আজ যদি এই ঘটনাকে ‘ছোট ছেলে’ বলে হালকাভাবে দেখা হয়, তাহলে আগামী দিনে এই প্রবণতা আরও ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে। একজন শিক্ষক হিসেবে এই ঘটনা অত্যন্ত অপমানজনক। আর তার চেয়েও বেশি লজ্জা হয় এটা ভেবে যে, আমরা যখন ছাত্র ছিলাম তখন শিক্ষকের বকুনি খেয়েছি, শাসন শুনেছি, কখনও হয়তো অন্যায় মনে হয়েছে। কিন্তু শিক্ষকের গায়ে হাত তোলার কথা কল্পনাও করতে পারিনি। কারণ তখন আমরা জানতাম—শিক্ষককে সম্মান করা মানে নিজের শিক্ষাকেই সম্মান করা।
আজকের প্রজন্মকে শুধু বইয়ের শিক্ষা দিলেই হবে না, দিতে হবে মানবিকতার শিক্ষা, শৃঙ্খলার শিক্ষা, সহনশীলতার শিক্ষা এবং শিক্ষককে সম্মান করার শিক্ষা। এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। দোষ প্রমাণিত হলে বয়সের অজুহাতে বিষয়টি ধামাচাপা না দিয়ে আইন ও বিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে কোনও ছাত্র শিক্ষককে আক্রমণ করার সাহস না পায়। একইসঙ্গে অভিভাবক, শিক্ষক এবং প্রশাসন—সকলকেই ভাবতে হবে, কোথায় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় মূল্যবোধের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। শিক্ষকের হাতে শাসনের প্রতীক হিসেবে ‘বেত’ ফিরিয়ে দেওয়া নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। তবে তার থেকেও বেশি জরুরি হল—শিক্ষকের হাতে আবার সেই সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া, যে সম্মান ছাড়া কোনও শিক্ষাব্যবস্থাই সুস্থভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। আজ একজন শিক্ষক রক্তাক্ত হয়েছেন। প্রশ্নটা তাই শুধু তাঁর নয়— আগামী দিনের সমাজকে আমরা কেমন করে গড়তে চাই, প্রশ্নটা আসলে সেটাই। শিক্ষকের গায়ে হাত তোলা মানে শুধু একজন মানুষকে আঘাত করা নয়—শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও সমাজের ভবিষ্যৎকেই আঘাত করা।










