এই মুহূর্তে ক্রীড়া/অনুষ্ঠান অন্যান্য সাহিত্য সম্পাদকীয় নোটিশবোর্ড

E-Paper

বিশেষ অভিজ্ঞতা

Published on: January 20, 2026 । 10:58 PM

মৌসুমী হাজরা: বাসে করে বাড়ি ফিরছিলাম। মনটা ভালো ছিল না সেদিন। বাস ছাড়তে ১৫ মিনিট দেরি আছে। বাসে উঠে একটা সিট খালি পেলাম, পাশের সিটে একজন যুবক বসে আছেন। জিজ্ঞাসা করে বললাম, এই সিটটা কি অন্য কারোর?
যুবকটি বললেন, না না, আপনি বসতে পারেন।
আমি বসলাম। ভাবলাম বলি, উইন্ডো সিটটা আমাকে দেবেন, ভালো লাগছে না, একটু হাওয়া খেতে খেতে যেতাম।
তারপর ভাবলাম, যদি না বলে দেয়, তাহলে আমার মনটা আরও খারাপ হয়ে যাবে। তাই মনের ইচ্ছে মনের মধ্যেই চেপে রাখলাম।
কিছুক্ষণ পর বাসে একজন বৃহন্নলা উঠলেন। যার যেমন ক্ষমতা, কেউ ৫ টাকা, কেউ ১০ টাকা দিচ্ছেন। তিনিও অবশ্য কারোর কাছে জোর করেন নি। তবে বাসে সবাইকে তিনি হাসাচ্ছিলেন। এবার আমার কাছে এসে বললেন, কই গো বান্ধবী, দেখি একটু তোমাকে। আমি চুপচাপ ব্যাগ থেকে ১০ টাকা বের করে দিলাম। তিনি সাথে সাথে আমার মাথায় হাত দিয়ে বললেন, কী হয়েছে গো? মনটা এত খারাপ কেন তোমার?
আমি হেসে বললাম, কই কিছু হয়নি তো। তিনি আবারও আমায় জোর করতে, আমি বললাম, মাকে ছেড়ে আবার ফিরে যাচ্ছি তো, তাই মনটা একটু খারাপ। তিনি বললেন, তা আর কিছুদিন থাকতে পারতে মায়ের কাছে, কি আর করবে বলো মেয়েদের জীবন এমনই হয়। তিনি আবার আমার মাথায় হাত বুলিয়ে চলে গেলেন।
বাস ছেড়ে দিয়েছে এবার। ধীরে ধীরে কিছুটা রাস্তা পার হলো। ইতিমধ্যেই আমি একবার গান শুনবো ঠিক করে, হেডফোন নিয়ে আবার ব্যাগে ঢুকিয়ে দিলাম। ফোনটা ঘাঁটতে ঘাঁটতে রেখে দিলাম।
কেমন যেন মনের মধ্যে এক অস্বস্তি বোধ হচ্ছিল। মাকে একবার ফোন করে বললাম, বাসে চেপে পড়েছি। মা বললো, পৌঁছে গিয়ে আগে ফোন করিস।
বাসটি এবার ধীর গতি ছেড়ে একটু স্পিড নিয়েছে। যুবকটি তখন নিজের ফোন রেখে আমার দিকে না তাকিয়ে বললো, ম্যাডাম, শুধু মেয়েরা নয়, ছেলেরাও এমন সাফার করে। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে বললাম, মানে?
যুবকটি হেসে বললেন, আমাদের পিছনে সিটের দিকে দেখুন।
আমি তাকিয়ে দেখলাম বৃদ্ধ দম্পতি বসে কথা বলছেন।
যুবকটি বললেন, ওনারা আমার মা বাবা। আমি ছেলে হয়েও তাদের কাছে থাকতে পারি না। কর্মসূত্রে অন্য জায়গায় থাকি। ছুটিতে এসেছিলাম। তাই মা বাবাকে নিয়ে মাসির বাড়ি ঘুরতে এসেছিলাম, সাথে ডাক্তারও দেখানো হলো। এখন বাড়ি ফিরছি। আর ২ দিন থেকে আবার আমাকে চলে যেতে হবে। মা – বাবা এখান থেকে যাবে না। বয়স হয়েছে তাদের। সারাদিন কাজের চাপ সাথে মা বাবাকে নিয়ে চিন্তা।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম। পরের স্টপেজে এসে বাস থামতেই। অনেক মানুষ চাপলো। কয়েকজন ছেলে আমাদের সিটের কাছে এসে দাঁড়ালো। যুবকটি বললেন, আপনি আমার সিটে আসবেন? উইন্ডো সিট কে ছাড়ে! সাথে সাথে জায়গা পরিবর্তন করলাম আমরা।
এরপর টুকটাক কথা হতে হতে আমি জানতে পারলাম, এইবারের পুজোর ছুটিতে উনি বাড়ি আসতে পারেন নি। ওনার রুমে একটা কালো বিড়াল আছে, তার নাম মিকি।
আমাদের কথা হলো, খেলা নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে।
আমি শোনালাম, আমার শৈশবের টুকরো কিছু স্মৃতির কথা। আমার বাড়িতে ২ টো কুলের গাছ ছিল। সরস্বতী পুজোর আগে খেয়ে নিতাম। তারপর মা সরস্বতীর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিতাম। রাস্তায় দাঁড়িয়ে সবার সাথে চাঁদা তুলতাম।
যুবকটি আমার কথা শুনে হাসছিলেন। এই সব কিছু উনিও করেছিলেন হয়তো। আমার কথার মাঝে একটুও থামান নি তিনি। হয়তো উনি চেয়েছিলেন আমি বলতে থাকি, কিংবা তখন ওনার শৈশবের কথা মনে পড়ছিল।
দেড় ঘন্টা পেরিয়ে গেল, উনি এবার হেসে বললেন, আমাকে এবার নামতে হবে। উঠে দাঁড়ালেন। বাস থামলো। মা বাবাকে ধরে নামানোর সময় একবার তাকালেন, আমি হেসে বললাম, থ্যাঙ্কিউ। উনিও হেসে নেমে গেলেন।
গাড়ি আবার চলতে শুরু করলো। পাশের সিটে তখন একজন বসেছেন, কোলে একটি ছোট্ট বাচ্চা। আমাকে বললেন, দিদি একবার বাচ্চাটাকে ধরবেন, আমি ব্যাগটা উপরে তুলে দিই!
আমি বাচ্চাটিকে কোলে নিতেই, বাচ্চাটি আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো। যেন আমাকে ভীষণ ভাবে চেনে। আমিও হাসলাম। মেয়েটি ব্যাগ ঠিক করে বললেন, দিন এবার ওকে।
আমি বললাম, থাক না একটু। যদি কাঁদে তখন না হয় দেবো।
সারা রাস্তা আমি তাকে জানালার বাইরের জগৎ দেখাতে দেখাতে এলাম। গাছগুলো ছুটে যাচ্ছে। দুইপাশে সবুজ গাছপালা। তবে ধুলোতে ঢেকে গেছে সামনের গাছগুলো। আবার বর্ষা এলে তারা স্নান সেরে সবুজ সতেজ হয়ে উঠবে।
আমার স্টপেজ এলো। আমি বাচ্চাটিকে তার মায়ের কাছে দিয়ে নামলাম। পাশ থেকে বাচ্চাটি তখন আমায় টা টা করছে।
আমি কারোর নাম জানলাম না, ঠিকানা জানলাম না। তবুও আমি লিখলাম তাঁদের জন্য। কারণ ওইসময় ওই মানুষগুলোকে আমার ভীষণ দরকার ছিল, আমার মন ভালো করার জন্য।
আমাদের জীবনটাও একটা বাস যাত্রার মতো। কিছু মানুষ আসবে, সবাই হয়তো ভালো হবে না। তবে সবাই কিছু না কিছু শিখিয়ে দিয়ে যাবে।

তৃপ্তি পাল কর্মকার

আমার প্রতিবেদনের সব কিছু আগ্রহ, উৎসাহ ঘাটাল মহকুমাকে ঘিরে... •ইমেল: [email protected] •মো: 9933066200 •ফেসবুক: https://www.facebook.com/triptighatal •মোবাইল অ্যাপ: https://play.google.com/store/apps/details?id=com.myghatal.eportal&hl=en ইউটিউব: https://www.youtube.com/c/SthaniyaSambad