এই মুহূর্তে ক্রীড়া/অনুষ্ঠান অন্যান্য সাহিত্য সম্পাদকীয় নোটিশবোর্ড

E-Paper

এক সন্তানকে হারিয়ে শত শত সন্তানকে আগলে রেখেছেন পান্নার অনুপ মাইতি

Published on: August 18, 2026 । 7:58 AM

কেয়া মণ্ডল চৌধুরী, ‘স্থানীয় সংবাদ’, ঘাটাল: জীবনের একটা সময় নিজের স্বপ্নকে বিসর্জন দিতে হয়েছিল সংসারের চাপে। মাত্র ১৪ বছর বয়সে হাতে তুলে নিতে হয়েছিল সোনার কাজের সরঞ্জাম। ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নটা থেকে গিয়েছিল মনের কোণে। তারপর কেটে গিয়েছে প্রায় ৪০-৫০ বছর। মুম্বাই শহরে স্বর্ণকারের কাজ করে কাটিয়েছেন জীবনের দীর্ঘ সময়। পরিচয় ছিল ‘পরিযায়ী শ্রমিকের’। কিন্তু অবসরের পর গ্রামে ফিরে সেই মানুষটিই এখন শত শত ছেলে-মেয়ের জীবনে নতুন স্বপ্ন দেখানোর চেষ্টা করছেন।
ঘাটাল মহকুমার অজবনগর-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের পান্না গ্রামের বাসিন্দা অনুপ মাইতি। প্রায় দেড় বছর আগে মুম্বই থেকে কাজের অবসর নিয়ে গ্রামে ফেরেন তিনি। গ্রামে ফিরে তাঁর চোখে পড়ে অন্য এক ছবি। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা মাঠে নেই। মোবাইলের নেশায় ডুবে রয়েছে অনেকেই। অল্প বয়সেই কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ছে মদ, গাঁজা-সহ নানা নেশায়। স্কুলের পড়াশোনায় মন নেই, মা-বাবার কথাও শুনছে না অনেকেই।
এই দৃশ্যই যেন অনুপবাবুর মনে পুরনো ফুটবলপ্রেমকে আবার জাগিয়ে তোলে। ছোটবেলায় তিনিও ভালো ফুটবল খেলতেন। কিন্তু সংসারের চাপে মাত্র ১৪ বছর বয়সেই পড়াশোনা ও খেলাধুলো ছেড়ে সোনার কাজে চলে যেতে হয়েছিল। ফুটবল নিয়ে অনেক স্বপ্ন থাকলেও জীবনের বাস্তবতার কাছে সেই স্বপ্নকে বিসর্জন দিতে হয়। মুম্বইতেও অবশ্য খেলার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল।
গ্রামে ফিরে তাই আর নিজের জন্য নয়, গ্রামের ছেলেমেয়েদের জন্য কিছু করার তাগিদ অনুভব করেন তিনি। তাঁর ভাবনা ছিল, ছেলেমেয়েদের যদি মোবাইলের স্ক্রিন থেকে বের করে মাঠে আনা যায়, তাদের পায়ে যদি ফুটবল তুলে দেওয়া যায়, তাহলে হয়তো অনেক শিশুকেই নেশা ও ভুল পথ থেকে দূরে রাখা সম্ভব হবে।
সেই ভাবনা থেকেই মাত্র ১১ জন ছেলেকে নিয়ে শুরু হয় তার পথচলা। ১১ থেকে ২১, ২১ থেকে ৩১, এভাবেই ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে সংখ্যা। বর্তমানে প্রায় ২৯৭ জন ছেলে-মেয়ে তাঁর সঙ্গে যুক্ত। এই সংখ্যাই তাঁকে আরও বেশি অনুপ্রাণিত করেছে।
শুধু ফুটবল নয়, শিশুদের শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ রাখার জন্য শুরু করেছেন যোগার প্রশিক্ষণও। নিজের খরচে কোচ রেখেছেন তিনি। কোচ সুব্রত মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে সপ্তাহে তিন দিন বুধবার, শুক্রবার ও শনিবার চলে ফুটবলের প্রশিক্ষণ। যোগার প্রশিক্ষণ নিজেই দেন অনুপবাবু। প্রশিক্ষণে আসা ছেলে-মেয়েদের জন্য সপ্তাহে তিন দিন নিজের খরচে টিফিনের ব্যবস্থাও করেন তিনি।
অনুপবাবু এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নাম দিয়েছেন ‘ঘাটাল পান্না নিহাল ফুটবল স্পোর্টস আকাদেমি’। আকাদেমিটি তিনি রেজিস্ট্রেশনও করিয়েছেন।
কিন্তু এই আকাদেমির নামের পিছনে লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর বেদনার গল্প।
করোনার আগেই মাত্র ১৯ বছর বয়সে মারা যায় অনুপবাবুর ছেলে নিহাল। বাবার মতোই নিহালেরও ফুটবলের প্রতি ছিল গভীর ভালোবাসা। ছেলেকে হারানোর সেই শোক আজও বয়ে বেড়ান অনুপবাবু। তাই ছেলের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে তাঁর নামেই আকাদেমির নাম রেখেছেন তিনি।
আজ মাঠে যখন শত শত ছেলে-মেয়ে দৌড়ায়, ফুটবল পায়ে নিয়ে তখন সেই ভিড়ের মধ্যেই যেন নিজের হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে খুঁজে পান অনুপবাবু। এক সন্তানের শূন্যতা যেন শত সন্তানের ভালোবাসায় তিনি খুঁজে বেড়ান।
অনুপবাবু বলেন, এক সন্তানকে হারিয়েছি। এখন এই শত শত সন্তানকে আগলে রাখতে চাই। এদের মধ্যেই আমার নিহাল বেঁচে থাকবে।
প্রতিটি ছেলে-মেয়েকেই নিজের সন্তানের মতো দেখেন তিনি। এমনকী তাদের জন্মদিনও নিজের উদ্যোগে পালন করেন। তাঁর উদ্দেশ্য একটাই গ্রামের অবহেলিত শিশুদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের মোবাইলের আসক্তি কমিয়ে খেলাধুলোর সঙ্গে যুক্ত করা এবং পড়াশোনায় মনোযোগী করে তোলা।
তবে একটা আক্ষেপও রয়েছে তাঁর। অনুপবাবুর কথায়, অভিভাবকেরা যদি তাঁর সঙ্গে আর একটু সহযোগিতা করতেন, তাহলে এই উদ্যোগ আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো। সেই সহযোগিতা টাকা দিয়ে নয়, মানসিকভাবে চান তিনি।
বর্তমানে ৬০ বছর বয়সেও থামেননি অনুপবাবু। স্ত্রী ও এক কন্যাকে নিয়ে তাঁর সংসার। জীবনযাপন অত্যন্ত সাদামাটা। নিজের জন্য বড় কিছু চাওয়ার নেই। মুম্বাইয়ে দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে অর্জিত অর্থের একটা বড় অংশই এখন ব্যয় করছেন এই ছেলে-মেয়েদের জন্য।
জীবনে যে ফুটবলটা তিনি নিজের পায়ে ধরে রাখতে পারেননি, আজ সেই ফুটবলই তুলে দিচ্ছেন গ্রামের বহু শিশুদের পায়ে। যে ছেলেকে হারিয়ে তাঁর জীবনে তৈরি হয়েছে গভীর শূন্যতা, সেই শূন্যতার মধ্যেই তিনি খুঁজে নিয়েছেন বেঁচে থাকার নতুন অর্থ।
এক সন্তানকে হারিয়ে শত সন্তানকে আগলে রাখার এই লড়াই শুধু একটি ফুটবল আকাদেমি তৈরির গল্প নয়, এ এক বাবার শোককে ভালোবাসায়, আর সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতায় পরিণত করার গল্প।

কেয়া মণ্ডল চৌধুরী

আমার শিকড় ঘাটালে, আর আমার লেখার মূল বিষয় এখানকার সাধারণ মানুষ। তাঁদের জীবনের না-বলা কথাগুলো সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমার প্রধান লক্ষ্য। আপনার আশেপাশে ঘটে যাওয়া এলাকার যেকোনো খবর জানাতে সরাসরি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করুন ৮৯০০০২০০০১ নম্বরে।