‘শ্রীশ্রী জগন্নাথদেব ও রথযাত্রা’ —উমাশংকর নিয়োগী
হিন্দুদের একটি বড় উৎসব রথযাত্রা। মূলত পুরীর শ্রীজগন্নাথদেবের রথযাত্রা উপলক্ষে দেশবিদেশের লক্ষ লক্ষ ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম হয়। প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্ল পক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে রথযাত্রা এবং শুক্লা দশমী তিথিতে পুনর্যাত্রা হয়ে থাকে। রথে চড়ে শ্রীজগন্নাথদেব বৈমাত্রেয় ভাইবোন শ্রীবলরাম এবং শ্রীসুভদ্রা সহ তাঁর আবির্ভাবস্থল গুণ্ডিচা বা মাসির বাড়ি যান সেখানে আট দিন থেকে ফেরতি রথে স্বস্থানে ফিরে আসেন। আসছি এসব কথায়। তার আগে জগন্নাথ, রথ ও যাত্রা সম্পর্কে দু চার কথা জেনে নিতে পারা যেতে পারে।
জগন্নাথদেব কোন সময় থেকে আরধিত হচ্ছেন তা নিয়ে নানামুনির নানামত হলেও বেশিরভাগ পণ্ডিত মনে করেন জগন্নাথ প্রাক্বৈদিক অনার্য দেবতা কিটুং। সত্যযুগেও তিনি আরাধিত হয়েছেন। ‘’ অদো যদ্দারু প্লবতে সিন্ধোঃ পারে অপুরুষম্।’ ১০। ১৫৫। ৩ ঋগ্বেদ। ভাষ্যকার সায়ণাচার্য ঋক্ মন্ত্রের সিন্ধুতীরে জলে ভাসমান কাষ্ঠখণ্ডকে জগন্নাথ বলে মনে করেছেন। রামায়ণের উত্তরকাণ্ডে, মহাভারতের অনুশাসন ও শান্তিপর্বে, মৎস্য, নারদ, অগ্নি ইত্যাদি পুরাণে জগন্নাথদেবের উল্লেখ আছ। অনেকে মনে করেন কলিঙ্গরাজ অনন্তবর্মন চোড় গঙ্গদেব (১০৭৮– ১১৫০ খ্রিঃ ) বর্তমানের মন্দির ও বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এ বিষয়ে পাথুরে প্রমাণ হিসেবে ১২৩০ খ্রিস্টাব্দে কূর্মেশ্বর মন্দিরের শিলালিপির কথা তাঁরা উল্লেখ করে থাকেন।রথের উল্লেখ আমাদের প্রাচীনতম ধর্মগ্রন্থ ঋগ্বেদ সংহিতায় পাওয়া যায়। ” দশ রথাৎ প্রষ্টিতমঃ শতং গো অথর্বভ্যঃ।অশ্বথঃ পায়বেঽদাৎ।।” ৬। ৪৭ । ২৪ ঋগ্বেদ । ‘অশ্বথ আমার ভ্রাতা পায়ুকে অশ্বগণের সাথে দশখানি রথ এবং অথর্ব গোত্র ঋষিগণকে একশত গো প্রদান করেছেন।’ ঐ মণ্ডলের ঐ সূক্তের সাতাশ মন্ত্রে ” বজ্রং হবিষা রথং যজ। ।” ইত্যাদি উল্লেখ আছে। উপনিষদের বহু মন্ত্রে রথের উল্লেখ আছে। দেহের সঙ্গে রথের তুলনা করা হয়েছে।

পৌরাণিক কাহিনীতে দেখা যায় শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবনে ফিরে এলে ব্রজগোপিনীরা তাঁকে রথে করে নিয়ে গিয়েছেন। রামায়ণে উন্নত রথ পুষ্পকরথে করে রাবণ সীতা হরণ করেছে। মহাভারতে ভীষ্মের অম্বা অম্বিকা আর অম্বালিকা হরণ, কৃষ্ণের রুক্মিণী হরণ,অর্জুনের সুভদ্রা হরণ রথে করেই। তাছাড়া মহাভারতের যুদ্ধে রথের ছড়াছড়ি। ঐতিহাসিক ভাবে রথের উল্লেখ পাওয়া যায় ফা– হিয়েনের বর্ণনায়। ফা– হিয়েন ভারতে ভ্রমণ করেছেন ৩৯৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৪১৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। ‘যা’ ধাতু থেকে নিষ্পন্ন যাত্রা শব্দটির অর্থ সাধারণত আমরা চলনশীলতা বুঝি। শুভম মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘শ্রীক্ষেত্রে জগন্নাথের যাত্রা প্রকরণ’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘’ সুবিখ্যাত কোষগ্রন্থ মেদিনীকোশ– এ বলা হয়েছে – ‘যাত্রা তু যাপনেহপি স্যাদ্ গমনোৎসবয়োঃ স্ত্রিয়াম্’।‘’ জীবনযাত্রা বলতে আমরা জীবনযাপনকে বুঝে থাকি। আবার যাত্রা বলতে বিশেষ করে দেবতাদের ক্ষেত্রে আমরা যখন রথযাত্রা,ঝুলনযাত্রা,রাসযাত্রা বা দোলযাত্রার কথা বলি, তখন দেবতার একস্থান থেকে অন্যস্থানে চলনকেই বুঝে থাকি। আমাদের পুরাণে যাত্রা বলতে উৎসবকেও বলা হয়েছে। দেবতাদের উৎসবে শোভাযাত্রা সহকারে দেবতাকে একস্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়ার সময় দেবতার মাহাত্ম্য বিষয়ে নানা নাটক অভিনীত হত। শব্দার্থের বিস্তার ঘটে যে কোনো নাটকের অভিনয়কেই যাত্রা বলা হয়ে থাকে। যাক্ গে ওসব কথা। জগন্নাথদেবের বারোমাসে বারোটি যাত্রা আছে। চন্দনযাত্রা, স্নানযাত্রা, রথযাত্রা, শয়নযাত্রা ইত্যাদির মধ্যে সবথেকে বেশি জনসমাগম হয় রথযাত্রায়।

জগৎ এবং নাথ এই দুটি শব্দের মিলিত রূপ জগন্নাথ। জগৎ শব্দের বুৎপত্তি, গমন্ + ক্বিপ্। যা চলছে।জগতে কোন কিছুই স্থির নয়।সবই চলছে।জগতের নাথ জগন্নাথ। চলমান সমস্ত জগতের প্রভু, আশ্রয় জগন্নাথ – নীলমাধব –দধিবামন,দারুব্রহ্ম। দা অর্থে জীবের সমস্ত কালিমা বিনাশ করেন যিনি এবং রু অর্থে মুক্তি দাতা। জগন্নাথকে ডাকার মতো ডাকতে পারলে জীবের সমস্ত কলুষ নাশ ্করে মুক্তি দেনজগন্নাথদেবের রথযাত্রায় কেবল বিষ্ণু ভক্তের সমাগম হয় তা নয়, সৌরশাক্তশৈব ও গাণপত্য সবাই অংশ গ্রহণ করেন। সনাতন শাস্ত্র মতে সপ্ততীর্থের এক তীর্থ, চারধামের এক ধাম পুরী এক সতীপীঠও। দক্ষযজ্ঞে শিবজায়া সতী পতিনিন্দা সহ্য করতে না পেরে দেহ ত্যাগ করেন। সতীর ,মৃতদেহ নিয়ে মহাদেব শুরু করেন তাণ্ডবনৃত্য। ত্রিভুবনের সমূহ বিপদ দেখে বিষ্ণু তাঁর সুদর্শনচক্র দিয়ে সতীর দেহ ছিন্নভিন্ন করে দেন। সেই সময় সতীর নাভী পড়ে পুরীতে। শাক্তদের একান্ন পীঠের অন্যতম পীঠ জগন্নাথ মন্দির চত্বরে দেবী বিমলার মন্দির। শাক্তরা শ্রীক্ষেত্রের দেবী বিমলার ভৈরব হিসেবে জগন্নাথকে দেখেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে কৃষ্ণের নাভী মতান্তরে অস্থি জগন্নাথদেবের দারু মূর্তির মধ্যে রেখে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়। বহু পণ্ডিত রথযাত্রাকে কৃষি উৎসব বলেছেন। এটি আষাঢ় মাসে হয়। কৃষ্ণ গোপালক, বলরাম হলধর ও সুভদ্রা বসুন্ধরা। অনেক মনে করেন নীলমাধব আদতে শবর তথা ব্যাধেদের দেবতা কিটুং। শবররা বৃক্ষকে দেবতা হিসেবে পুজো করে। হাত পা হীন দারুব্রহ্ম আর্যীকৃত হয়ে জগন্নাথ। জরা ব্যাধ বা বিশ্বাবসু জগন্নাথ দেবের প্রতিষ্ঠা করেন।পরে ইন্দ্রদ্যুম্নের আধিকারে যায়। জগন্নাথ কীভাবে পুরীতে এলেন বা সত্যযুগে অবন্তীর সূর্যবংশীয় রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন তাঁর সেবক হয়ে উঠলেন সেই সম্পর্কে লোককাহিনি প্রচলিত আছে।
সে অনেক দিন আগেকার কথা। তখন উৎকলরাজ ইন্দ্রদ্যুম্ন। তাঁর রাজ্যে গভীর অরণ্যে শবরজাতির লোকের বসবাস করত। শবরদের কুলদেবতা দেবতা কিটুং। নিবিড় অরণ্যে সকলের অলক্ষে কিটুং এর অবস্থান। শবর অধিপতি বিশ্বাবসু তাঁর নিত্য আরাধনা করতে অরণ্যে যান। অনার্য শবরদের দেবতার আরাধনা ও দর্শন করার অধিকার কেবল তাদেরই। উৎকলরাজ ইন্দ্রদ্যুম্ন একদিন তিনি রাজসভায় বসে আছেন। এমন সময় এক পরিব্রাজক বৈষ্ণব এসে জানিয়ে গেল , স্বয়ং জগন্নাথ শ্রীবিষ্ণু নীলমাধব মূর্তিরূপে উৎকল দেশে আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি পুরুষোত্তমক্ষেত্র পুরীতে অবস্থান করে আপামরজনের দেবতা হবেন। রাজা দিকে দিকে দূত পাঠালেন নীলমাধবের খোঁজে। সবাই ব্যর্থ হয়ে ফিরে এল। অবশেষে রাজপুরোহিত নবযুবক বিদ্যাপতি রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের অনুমতি নিয়ে নীলমাধবের অনুসন্ধানে বেরলেন। খুঁজতে খুঁজতে এসে উপস্থিত হলেন শবর সর্দার বিশ্বাবসুর পল্লিতে। কিছুদিন অবস্থান করার পর বিদ্যাপতির নজরে এল প্রতিদিন বিশ্বাবসু ঊষাকালে সকলের অলক্ষে একাকী পল্লী সংলগ্ন অরণ্য মধ্যে প্রবেশ করেন। বেশ কিছুটা সময় পরে ফিরে আসেন। কৌতূহলী হয়ে উঠলেন বিদ্যাপতি। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন , শবর সর্দার নিত্যদিন তাদের কুলদেবতার পুজো করতে যান। কী জানি কেন বিদ্যাপতির মনে হতে লাগল শবরদের কুলদেবতাই নীলমাধব।

ছদ্মবেশি বিদ্যাপতি মুখে কিছু বললেন্ না,পল্লির পরিবারগুলির সেবার মধ্য দিয়ে তাদের আস্থা অর্জনের ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে গেলেন। অবশেষে বিদ্যাপতির বিদ্যাবুদ্ধি,বীরত্ব,আনুগত্য,কর্ম
বিদ্যাপতি ফিরে গিয়ে ইন্দ্রদ্যুম্নের কাছে সবিস্তারে সবকিছু জনালেন। রাজা নিজে সৈন্যসামন্ত নিয়ে তুলো / সরষে গাছের চিহ্ন ধরে দেবতাকে আনতে গিয়ে দেখলেন দেবতা সেখানে নেই। রাজা অনুমান করলেন শবর সর্দার বিশ্বাবসুই দেবতাকে অন্যত্র লুকিয়ে রেখেছেন।তাই রাজা যখন বিশ্বাবসুকে বন্দি করে নিয়ে এসে কারাগারে রাখার কথা ভাবছেন তখন দৈববাণী হল। রাজা যেন বিশ্বাবসুকে ছেড়ে দেন এবং নীলমাধবের জন্য মন্দির তৈরি করেন। রাজা ফিরে এসে নীলমাধবের মন্দির নির্মাণ করে দেবতার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। অবশেষে রাজার কাতর প্রার্থনায় স্বপ্নাদেশে জানতে পারলেন, তিনি দারুব্রহ্ম রূপে সমুদ্রে ভেসে এসে ‘বাঙ্কিমুহানের’কাছে অবস্থান করছেন।পরদিন ঊষা কালে সপারিষদ রাজা গিয়ে শঙ্খ,চক্র,গদা,পদ্ম ইত্যাদি চিহ্নিত কাষ্ঠখণ্ড দেখতে পেলেন। বিশ্বাবসু ও বিদ্যাপতি সহ অন্যান্যদের সহায়তায় কাষ্ঠখণ্ডটিকে রথে করে মন্দির প্রাঙ্গণে আনা হল। জগন্নাথের কৃপাধন্য অনন্ত মহারানা নামে এক বৃদ্ধ সূত্রধর দেবমূর্তি নির্মাণের দায়িত্ব নিলেন। রাজার সঙ্গে চুক্তি হল অনন্ত মহারানার। তিনি বন্ধঘরে ২১ দিনের মধ্যে মূর্তিগুলি তৈরি করবেন। সেই সময় কেউ ঘরের মধ্যে প্রবেশ করতে পারবে না। কিন্তু ১৪ দিনের দিন রাজা কৌতূহল দমন করতে না পেরে বন্ধঘরের দরজা খুলে দেখলেন ঘরের ভেতরে অনন্ত মহারানা নেই, চারটি মূর্তি আছে। সুদর্শন, সুভদ্রা, বলরাম ও জগন্নাথ।বিগ্রহগুলির হাতের আঙুল নেই আর শ্রীচরণ নেই। অনুশোচনার আগুনে পুড়ে নিখাদ রাজা শাস্ত্রীয় নিয়মানুসারে মন্দিরে দেবতাগুলির প্রতিষ্ঠা করলেন। উৎকলরাজ ইন্দ্রদ্যুম্নকে দেওয়া জগন্নাথদেবের আজ্ঞায় বিশ্বাবসুর বংশধরেরা আজও জগন্নাথের সেবক তথা দয়িতা, দশপল্লা বা দাসপল্লার সূত্রধর অনন্তমহারানার সন্তানেরা বংশ পরম্পরায় সেই সময় থেকে দেবতাদের নবকলেবর ও রথ নির্মাণ করে আসছেন, বিদ্যাপতির শবর পত্নী ললিতার সন্তারেরা ভোগ রান্না করেন আর বিদ্যাপতির ব্রাহ্মণীর সন্তানেরা জগন্নাথের পুজো করে চলেছেন।
রথের জন্য কাঠ সংগ্রহ করা শুরু হয় সরস্বতী পুজোর দিন।ফাসি, ধৌসা ইত্যাদি কাঠ আসে দশপল্লা জেলার রণপুর জঙ্গল থেকে। রথে কোন নাট, বোল্ট,স্ক্রু নেই। প্রতি বছর নতুন করে রথ তৈরি হয়। রথের শেষে কাঠগুলো জগন্নাথদেবের ভোগ রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। রণপুর জঙ্গলে প্রতি বছর যে পরিমাণ গাছ কাটা পড়ে তার দশগুণ গাছ লাগানো হয়। রথযাত্রার দিন প্রথমে থাকে বলরামের রথ মধ্যে থাকে সুভদ্রার রথ আর সবার শেষে থাকে জগন্নাথের রথ। আষাঢ় মাসে সপার্ষদ জগন্নাথ রাজরাজেশ্বর বেশ পরেন। সুনাবেশ পরে রথে সবার আগে ওঠেন সুদর্শন।
গুণ্ডিচাযাত্রা বা রথযাত্রার সময় প্রথমে থাকা বলরামের রথের নাম তালধ্বজা বা লাঙলধ্বজা। রথের রক্ষক বাসুদেব। রথে প্রায় ৭ ফুট ব্যাসের চাকা থাকে চোদ্দটি। চোদ্দটি চাকা চোদ্দ ভুবনের প্রতীক। বলরামের রথটির দৈর্ঘ্য–প্রস্থ ৩৩ ফুট, উচ্চতা ৪৩ ফুট ৩ ইঞ্চি। পতাকার নাম উন্নানী।সাতশো তেষট্টিটি কাঠের টুকরো দিয়ে রথ তৈরি হয়। লাল ও সবুজ কাপড়ে সাজানো হয় রথটিকে। দেড়শো ফুট রথের রশির নাম বসুকিনাগ।রথের রক্ষক শেষাবতার,সারথি মাতালি।কালো রঙের ঘোড়া চারটির নাম স্থিরা, ধৃতি, স্থিতি ও সিদ্ধা মতান্তরে তিবরা, ঘোরা, দীর্ঘশর্মা ও স্বর্ণাভা। দ্বারপাল দ্বয়ের নাম নন্দা ও সুনন্দা। বলরামের সঙ্গে রথে উঠেন রামকৃষ্ণ।ইনি পাশেই থাকেন। এছাড়া রথে থাকেন কার্তিক, গণেশ,সর্বমঙ্গলা,মৃত্যুঞ্জয়, মুক্তেশ্বর ,হলায়ুধ, প্রলম্বঘ্ন, শেষদেব, মহেশ্বর ও নট্যম্বর।
সুভদ্রার রথের নাম দর্পদলন, পদ্মধ্বজ বা দেবদলন। দর্পদলনে প্রায় ২২ফুট পরিধির বারোটি চাকা থাকে। চাকাগুলি বারো মাসের প্রতীক। রথটি দৈর্ঘ্য–প্রস্থে ৩১ফুট ৬ ইঞ্চ এবং উচ্চতায় ৪২ ফুট ৩ ইঞ্চি। কাঠের টুকরো থাকে পাঁচশ তিরানব্বইটি।পতাকার নাম নাদাম্বিকা। সুভদ্রার রথ লাল কালো কাপড়ে সাজানো থাকে। রথের রক্ষক জয়দুর্গা, সারথি অর্জুন।রোচিকা, মোচিকা, জিতা, অপরাজিতা মতান্তরে অধর্ম, অজ্ঞান, অপরাজিতাও জ্যোতিনী লাল রঙের ঘোড়াদের নাম। সুভদ্রাদেবীর রথে দ্বারপাল হিসেবে থাকেন গঙ্গা ও যমুনা। সুভদ্রার সঙ্গে রথে ওঠেন সুদর্শন। এছাড়া রথে থাকেন চণ্ডী, চামুণ্ডা,উগ্রতারা, বনদুর্গা, শূলিদুর্গা,বারাহী, শ্যামাকালী,মঙ্গলা,বিমলা। রথের রশির নাম স্বর্ণচূড়া নাগিনী। জগন্নাথদেবের রথের নাম নন্দীঘোষ/ গরুড়ধ্বজ/কপিধ্বজ। এই রথের চাকা ষোলটি। প্রত্যেকটির ব্যাস সাত ফুট। জগন্নাথদেবের রথ দৈর্ঘ্য–প্রস্থে ৩৪ ফুট ৬ইঞ্চি। নন্দীঘোষের উচ্চতা ৪৪ ফুট ২ ইঞ্চি। মূল কাঠামোর দুশ ছটি কাঠ সহ মোট আটশো বত্রিশটি কাঠের টুকরো দিয়ে রথ তৈরি হয়। সামনে সাদা রঙের চারটি ঘোড়া থাকে। ঘোড়াগুলির নাম শ্বেতা, বলাহক, রহিদাশ্ব ও শঙ্খ মতান্তরে রোচিকা, মোচিকা,সূক্ষ্মা ও অমৃতা। রথের রক্ষক গরুড়। সারথির নাম দারুকা। রথের দ্বারপাল হিসেবে থাকেন জয়া, বিজয়া। লাল হলুদ কাপড়ে সজ্জিত করা হয় রথকে। এই রথের চূড়ায় ত্রৈলোক্যমোহিনী নামে পতাকা উড়ে।জগন্নাথের সঙ্গে রথে উঠেন মদনমোহন। এছাড়া রথে থাকেন গোবর্ধনকৃষ্ণ, গোপীকৃষ্ণ, বরাহ, নৃসিংহ ,রাম ,নারায়ণ, হনুমান, রুদ্র ও ত্রিবিক্রম। পতাকায় গরুড় থাকে।রথের রশিটি দেড়শ ফুট লম্বা। রথের রশির নাম শঙ্খচূড় নাগিনী। রথ চলার সময়ে তিনটি চাকার দাগ পড়ে। এদের নাম গঙ্গা যমুনা সরস্বতী। অনেক বলেন ঈড়া পিঙ্গলা সুষুম্না,সত্ত,তম ও রজ। ষোলটি চাকা দশটি ইন্দ্রিয় ও ষড় রিপুর প্রতীক। দুশ ছটি মূল কাঠ মানব দেহের হাড়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
মন্দিরে থাকার সময় দিব্যত্রয়ীকে বাল্যভোগ, রাজভোগ, ছত্রভোগ ইত্যাদি ভোগ নিবেদন করা হয়। রথে ওঠার পর যে ভোগ নিবেদিত হয় তার নাম রথোপরিভোগ। নি–সকড়ি এই ভোগে চালের গুঁড়ার পরিবর্তে গমের গুঁড়ো ব্যবহার হয়। রথ পথে থাকার সময় দূর থেকে যে ভোগ নিবেদন করা হয় তা দাণ্ডপন্তিভোগ নামে আখ্যাত।
বলরাম গুরু , সুভদ্রা ভক্তি এবং জগন্নাথ পরমেশ্বরর প্রতীক। গুরুর কৃপা এবং ভক্তি যোগে ঈশ্বর লাভ হয়। জগন্নাথদেবের রথ চলে সবার স্পর্শে। সবার আগে বলরাম। লাঙল কাঁধে বলরাম কৃষি সভ্যতার প্রতীক। মধ্যে সুভদ্রা মাতৃশক্তির প্রতীক। জগন্নাথ জগৎ চালনা করেন এই দুই প্রধান শক্তিকে অবলম্বন করে। মানব সভ্যতার অগ্রগতিতে সকলের সহযোগিতার প্রয়োজন, জাতিধর্মবর্ণ এখানে যে গৌণ তা রথযাত্রায় তা বোঝানো হয়েছে। আবার রথের মধ্যে দেহতত্ব লুকিয়ে আছে। দুর্ভাগ্য রথের দিন আমরা রথের রশিতে টান দি , পরে এর উদ্দেশ্যে ভুলে যাই। কবে আমরা বলার সাথে সাথে উপলব্ধি করবো যে, ” ওঁ সহ নাববতু। সহ নৌ ভুনক্তু। সহ বীর্যং করবাবহৈ।তেজস্বিনাবধীতমস্তু। মা বিদ্বিষাবহৈ।
তথ্য উৎস:
শ্রীক্ষেত্র ১ম খণ্ড সুন্দরানন্দ বিদ্যাবিনোদ(পৃষ্ঠা-১৬১)
উদ্বোধন আষাঢ় ১৪৩২
সাপ্তাহিক বর্তমান ২৮ জুন ২০২৫ ইত্যাদি।
‘শ্রীশ্রী জগন্নাথদেব ও রথযাত্রা’ —উমাশংকর নিয়োগী






