কাজলকান্তি কর্মকার [M-9933066200]: ঘাটাল শহরে তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে তালা দেওয়া হল। বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেস কিংবা তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ কোনও গোষ্ঠী নয়, বাড়ির মালকিন তথা ঘাটালের প্রাক্তন বিধায়ক শঙ্কর দলুইয়ের স্ত্রী তরুলতা দলুই ওই কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। শুধু তালাই ঝোলাননি, সেখানে কারা আসছেন বা কী করছেন, তা জানার জন্য সিসি ক্যামেরাও বসিয়েছেন তিনি। দলীয় কার্যালয়ে তালা ঝোলানোর কথা স্বীকার করে নিয়েছেন তৃণমূলের ঘাটাল ব্লক সভাপতি দিলীপকুমার মাজি। কেন শঙ্করবাবু দলীয় কার্যালয়ে তালা দিলেন? তাঁর উদ্দেশ্যই বা কী? সেটাই এই ভিডিওতে ব্যাখ্যা লিখেছেন সাংবাদিক কাজলকান্তি কর্মকার। আমি সেই লেখাটি পাঠ করছি মাত্র!
তার আগে ঘাটাল শহরের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে যেখানে তৃণমূলের পার্টি অফিসটি রয়েছে সেই বাড়ি ও জায়গার ইতিহাসটি জানা জরুরি। ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের যে জায়গার উপর দলীয় কার্যালয়টি রয়েছে তার জমি নিয়ে একাধিক বিতর্কিত তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। ওই জায়গা এবং বাড়ির মালিক ছিলেন কুশপাতার বাসিন্দা শ্যামকুমার লাল। তিনি তাঁর ওই জায়গার উপর তাঁর ভাই সরোজকুমার লালের আর্থিক সহযোগিতায় একটি বাড়ি তৈরি করেন। ২০০৮ সাল নাগাদ দুর্ঘটনায় শ্যামকুমার লাল প্রাণ হারান। তাঁর মৃত্যুর পর আইনত ওই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন তাঁর মা কমলা লাল, স্ত্রী কল্পনা লাল এবং মাত্র সাত মাস বয়সী কন্যা দিয়া লাল। অভিযোগ, স্বামী মারা যাওয়ার পর কল্পনা লাল বিশেষ কোনও উপায় অবলম্বন করে নাবালিকা মেয়ের সম্পত্তি এবং শাশুড়ির সম্পত্তি সহ পুরো জায়গা ও বাড়িটি বেআইনিভাবে ২০০৯-২০১০ সাল নাগাদ এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দেন। এরপর তিনি মেয়েকে নিয়ে অন্যত্র বিবাহ করে চলে যান। জমি বিক্রির বিষয়টি প্রথমে কমলা লালের অজানা থাকলেও, ক্রেতারা যখন সম্পত্তির অধিকার দাবি করতে আসেন, তখন জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এরপর কমলা লাল তাঁর নিজের অংশটুকু তাঁর অপর এক ছেলে সরোজ কুমার লালের নামে লিখে দেন। সরোজবাবু সেখানে একটি হোটেল চালু করেন। কিন্তু জমি বাড়ি বিতর্ক তখন তুঙ্গে। জমি নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে এটা জানতে পেরেই ২০১২ সালে তৃণমূলের সদ্য বিধায়ক শঙ্কর দোলই তুলনামূলকভাবে অনেক কম দামে সেই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে শঙ্করবাবুর স্ত্রী তরুলতা দোলইয়ের নামে কিনে নেন। তারপরই ২০১২ সালে কালীপুজোর পর কয়েক শ তণমূল কর্মীদের নিয়ে সরোজবাবুর হোটেলের জিনিসপত্র বার করে দিয়ে ওই বাড়িটি দখল করেন। পরে তরুলতা দোলই ওই বাড়ির আন্ডারগ্রাউন্ড এবং তার উপরে তলটি তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করার জন্য তিন তৃণমূল নেতা দিলীপ মাজি, অজিতরঞ্জন দে এবং তৃণমূলের বিধায়ক শঙ্কর দোলইয়ের নামে লিখিত অনুমতি দেন। পরবর্তী সময়ে ওই বাড়ির আরও দুটি তল তৈরি হয় যেগুলি শঙ্করবাবু নিজে ব্যবহার করেন।
সেই থেকেই পার্টি অফিসটি চলতে থাকে। বর্তমানে রাজ্যে পালা বদলের পরেই শঙ্করবাবুর পরিবারের পক্ষ থেকে ওই দলীয় কার্যালয়টিতে তালা দিয়ে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে সিসি ক্যামেরাও লাগিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু শঙ্করবাবু এটা করতে গেলেন কেন? অনেকে বলছেন শঙ্করবাবু বিজেপিতে যোগদেবেন পরে ওই অফিসটি বিজেপির দলীয় কার্যালয় হবে। আবার অনেকের অভিমত শঙ্করবাবু নিজেই তৃণমূলের অফিস খুলে বসবেন। ওই দুটো অভিমতের কোনওটিই বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ, বেশ কয়েক বছর হল তৃণমূলের শঙ্করবাবুর অবস্থান ভালো নয়। অনেকটাই কোণঠাসা অবস্থায় তিনি রয়েছেন। দ্বিতীয়ত রাজ্যস্তরে তৃণমূলের যা অবস্থা তাতে তৃণমূল আদৌ আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তাই তৃণমূলের দলীয় কার্যালয় হিসেবে ওই বাড়িটি আর ব্যবহার কোনও সম্ভাবনা এই মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে না।
দ্বিতীয়ত বিজেপি শঙ্করবাবুকে নেবে কি নেবে না সেটা ভবিষ্যৎ বলবে। তর্কের খাতিরে ধরেই নেওয়া হল বিজেপিতে শঙ্করবাবু যোগদান করলেন। বিজেপিতে যোগদানের পর শঙ্করবাবু কয়েক কোটি টাকার ওই জায়গা সহ বাড়িটি বিজেপির দলীয় কার্যালয়ের জন্য ছেড়ে দেবেন এটা বিশ্বাস যোগ্য নয়। কারণ বিজেপিতেও শঙ্করবাবুর স্থায়ীত্ব কতটা হবে, আদৌ বিজেপির বিশাল জনসমুদ্রে তিনি টিকে থাকতে পারবেন কিনা তার জন্য তিনি ওই ঝুঁকি কখনোই নিতে যাবেন না।
তাহলে তিনি কেন তালা দিলেন? উদ্দেশ্য একটাই কারণ পুরো বাড়িটি নিজের দখলে আনা। সারা রাজ্যে তৃণমূলের অবস্থা খুবই সঙ্গীন। ঘাটাল ব্লক তথা মহকুমার অন্যান্য তৃণমূল নেতারা ভয়ে হতাশায় বাড়ি থেকে বের হচ্ছেন না। এই মুহূর্তে তৃণমূল নেতাদের কোনও আন্দোলন করার মতো সাহস বা মানসিক বল নেই। সেই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়েই তিনি পুরো সম্পত্তিটি নিজের দখলে নিয়ে নিলেন। পরবর্তী সময়ে ওই বাড়িটি কোনও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বা ব্যাঙ্ককে ভাড়া দিয়ে সমস্ত বিতর্কের অবসান ঘটাবেন।





