“You deal with Google, which creates stress. I deal with God, who releases stress.”
—Debasish Sarkar[Central Govt. Employee] লখকের ফেসবুক লিঙ্ক
লন্ডনের এক মঞ্চে তখন বসে ছিলেন হাজারো মানুষ। ২০২৫ সালের India Global Forum। বক্তা গৌরাঙ্গ দাস — গেরুয়াবস্ত্র, শান্ত দৃষ্টি, কণ্ঠে এক অদ্ভুত স্থিরতা।
হঠাৎ তিনি থামলেন। হাসলেন। আর বললেন এমন একটা গল্প, যা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়বে সারা বিশ্বে।
“একদিন আমার দেখা হয়েছিল সুন্দর পিচাইয়ের সঙ্গে,” বললেন তিনি।
সেই দিনের কথা মনে করে গৌরাঙ্গ দাস বললেন—
সুন্দর পিচাই হাসি মুখে বললেন— “You look younger than me.”(আপনাকে তো আমার চেয়েও কম বয়সী দেখাচ্ছে!)
গৌরাঙ্গ দাস মুচকি হেসে যে উত্তরটা দিলেন, সেটাই বদলে দিল গোটা মুহূর্তের রঙ।
“You deal with Google, which creates stress. I deal with God, who releases stress.”
— আপনি Google নিয়ে থাকেন, যা মানুষের মধ্যে চাপ তৈরি করে। আর আমি ঈশ্বরকে নিয়ে থাকি, যিনি সেই চাপ থেকে মুক্তি দেন।
একটা ছোট্ট রসিকতা। কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল একটা গোটা যুগের প্রশ্ন। লন্ডনের সেই হলঘরে হাসির একটা ঢেউ উঠল। কিন্তু গৌরাঙ্গ দাস জানতেন, এই কথাটা নিছক রসিকতার জন্য বলা নয়—এর পেছনে লুকিয়ে আছে আজকের গোটা পৃথিবীর এক নীরব সংকটের ইঙ্গিত। আর সেই ইঙ্গিতটা বুঝতে হলে ফিরে যেতে হয় অনেক বছর পেছনে, যেখান থেকে শুরু এই দুই মানুষের সম্পূর্ণ আলাদা দুটো জীবনযাত্রা।
সময়টা ছিল ভারতের এক ব্যস্ত, উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রজন্মের গল্প লেখার সময়। দেশের সবচেয়ে কঠিন প্রবেশপরীক্ষা পার করে যে হাতে গোনা কয়েকজন তরুণ IIT-তে পা রাখতেন, তাঁদেরই দুজন ছিলেন সুন্দর পিচাই আর গৌরাঙ্গ দাস। তবে একসঙ্গে নয়। একই ছাদের নিচে নয়। সুন্দর পিচাই পড়েছিলেন IIT Kharagpur-এ। গৌরাঙ্গ দাস পড়েছিলেন IIT Bombay-তে। একই প্রজন্ম, একই স্বপ্নের বীজ বহন করা দুটো ক্যাম্পাস—তবু দুটো আলাদা জগৎ। কলেজজীবনে তাঁদের মধ্যে পরিচয়ও ছিল না। একজন আরেকজনের নামও হয়তো শোনেননি তখন।
দুজনেই মেধাবী। দুজনেই স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু কেউ জানত না, ভবিষ্যৎ তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছে সম্পূর্ণ দুই মেরুর জীবন।
সুন্দর পিচাইয়ের যাত্রা শুরু হলো প্রথাগত পথে—আরও পড়াশোনা, বিদেশে উচ্চশিক্ষা, তারপর প্রযুক্তি জগতে পা রাখা। ধাপে ধাপে, বছরের পর বছর পরিশ্রমে তিনি উঠে এলেন বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে। তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব আজ পৌঁছে যায় কোটি কোটি মানুষের হাতের পর্দায়, পকেটে, দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে।
তিনি বেছে নিলেন সম্পূর্ণ অন্য এক পথ। IIT Bombay থেকে পাশ করার পর সামনে খোলা ছিল ঝকঝকে পেশাগত জীবনের হাতছানি। কিন্তু তিনি সেই পথ থেকে সরে দাঁড়ালেন। পরনে উঠল গেরুয়া বসন। যুক্ত হলেন ISKCON-এর সঙ্গে, হয়ে উঠলেন সন্ন্যাসী ও আধ্যাত্মিক শিক্ষক। লেখালেখি করলেন, কথা বললেন মানসিক দৃঢ়তা আর মনোযোগের মতো বিষয় নিয়ে।
একজনের কর্মক্ষেত্র হয়ে উঠল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি।
অন্যজনের কর্মক্ষেত্র হয়ে উঠল মানুষের মন, মূল্যবোধ, আত্মশুদ্ধি আর সেবার এক অদৃশ্য জগৎ।
বছরের পর বছর কেটে গেল এভাবেই। একজন প্রযুক্তির শীর্ষে, অন্যজন আধ্যাত্মিকতার গভীরে। দুটো জীবন, দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন কক্ষপথ, একে অপরের থেকে যোজন যোজন দূরে।
তারপর, বহু বছর পর, একদিন—তাঁদের দেখা হয়ে গেল।
সেই মুহূর্তে দুজনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন নিজের নিজের জগতের প্রতিনিধি হয়ে। একদিকে বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধান। অন্যদিকে আধ্যাত্মিক জগতের এক শান্ত, স্থির উপস্থিতি।
আর তখনই সেই সংলাপ—যা এখন গোটা বিশ্ব জানে।
আসক্তি। একাকিত্ব। উদ্বেগ। মানসিক ক্লান্তি।
লন্ডনের সেই মঞ্চে গৌরাঙ্গ দাস বললেন—ভারতের প্রায় ৭০ শতাংশ কিশোর-কিশোরী প্রতিদিন গড়ে সাত ঘণ্টা সময় কাটায় স্ক্রিনের সামনে। বিশ্বজুড়ে প্রতি সাতজনের একজন মানুষ প্রতিনিয়ত লড়ছেন কোনো না কোনো মানসিক সমস্যার সঙ্গে।
ভাবুন তো একবার—আমাদের ঘুম ভাঙে ফোনের আলোয়। খাবার টেবিলে বসেও চোখ থাকে পর্দায়। কাজের ফাঁকে ফাঁকে আঙুল আপনাআপনি চলে যায় স্ক্রিনের দিকে। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগেও শেষ যে জিনিসটা আমরা ছুঁয়ে দেখি, সেটাও ফোন।এক টুকরো কাচ আর ধাতুর যন্ত্র, নিঃশব্দে কেড়ে নিচ্ছে আমাদের মনোযোগ, আমাদের সময়, আর কোথাও গিয়ে—আমাদের ভেতরের শান্তিটুকুও।
কিন্তু এই গল্প প্রযুক্তির বিরুদ্ধে নয়।Google পৃথিবীর সব জ্ঞানকে এনে দিয়েছে আমাদের হাতের মুঠোয়। ইন্টারনেট দূরত্ব ঘুচিয়েছে, মানুষকে মানুষের কাছাকাছি এনেছে। চিকিৎসা থেকে শিক্ষা, ব্যবসা থেকে যোগাযোগ—প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ঘটিয়েছে বিপ্লব। আসল প্রশ্নটা অন্য জায়গায় লুকিয়ে। প্রযুক্তি কি সত্যিই আমাদের জীবন সহজ করছে? নাকি ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে, আমাদের মনকেই করে তুলছে আরও অস্থির, আরও ক্লান্ত, আরও একা?
এখানেই সুন্দর পিচাই আর গৌরাঙ্গ দাসের গল্পটা হয়ে ওঠে আসলে আমাদের সবার গল্প। একজন প্রযুক্তি দিয়ে ছুঁয়েছেন কোটি কোটি মানুষের জীবন। অন্যজন ছুঁতে চেয়েছেন মানুষের ভেতরের জগৎ—যেখানে কোনো অ্যালগরিদম পৌঁছাতে পারে না। তবু দুজনের গল্পে একটা আশ্চর্য মিল থেকে যায়—দুজনেই ছিলেন IIT-র মেধাবী ছাত্র। দুজনেই একদিন নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলেন। শুধু “সাফল্য” শব্দটার মানে দুজনের কাছে ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। সুন্দর পিচাইয়ের যাত্রা আমাদের শেখায়—একটি সাধারণ পরিবারের ছেলে কীভাবে অধ্যবসায় আর কঠোর পরিশ্রমে পৌঁছে যেতে পারে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী আসনে। আর গৌরাঙ্গ দাসের যাত্রা মনে করিয়ে দেয়—জীবনের প্রতিটি সাফল্য টাকা, পদ বা পরিচিতি দিয়ে মাপা যায় না।
কখনো কখনো একজন মানুষ নিজের সামনে থাকা সবচেয়ে চকচকে পথটা ছেড়ে বেছে নেয় এমন এক পথ, যার পুরস্কার চোখে দেখা যায় না—শান্তি। সেবা। আত্মতৃপ্তি। মানুষের জন্য কিছু করার নিঃশব্দ আনন্দ। আর হয়তো, নিজের সঙ্গে নিজের আরেকটু গভীর পরিচয়।
দুটো জীবন। দুটো সম্পূর্ণ আলাদা পথ। দুটো ভিন্ন সংজ্ঞা। কিন্তু সেই একটামাত্র বাক্য যেন দুজনের গল্পকে এক ফ্রেমে বেঁধে ফেলল চিরকালের জন্য— “You deal with Google… I deal with God.”
কথাটা শুনে প্রথমে হাসি পায়। কিন্তু হাসি থামার পরেই এসে দাঁড়ায় একটা নীরব, অস্বস্তিকর প্রশ্ন।
আমরা কি সারাজীবন শুধু বাইরের পৃথিবীটাকেই জয় করার চেষ্টা করে যাচ্ছি? ভালো চাকরি চাই। বেশি টাকা চাই। বড় বাড়ি চাই। দামি গাড়ি চাই। বেশি পরিচিতি চাই। আরও, আরও, আরও সাফল্য চাই।
কিন্তু এই দৌড়ের মাঝে কখনো কি নিজেকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করি— “আমি নিজে কি সত্যিই শান্তিতে আছি?”
সম্ভবত এটাই গৌরাঙ্গ দাসের কথার সবচেয়ে মানবিক দিক।
তিনি Google-কে ছোট করেননি। সুন্দর পিচাইকেও ছোট করেননি। বরং দুই ভিন্ন জীবনের ছবি এঁকে মনে করিয়ে দিয়েছেন—বাইরের উন্নতির পাশাপাশি ভেতরের শান্তিটাও সমান জরুরি।
আজ আমরা পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে কয়েক সেকেন্ডে খবর পাঠাতে পারি। কিন্তু পাশের ঘরে বসে থাকা প্রিয় মানুষটার সঙ্গে মন খুলে দুটো কথা বলার সময় হয়তো আর পাই না।
হাজার হাজার মানুষ আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখতে পারে। কিন্তু আমাদের আসল কষ্টটা বোঝে, এমন মানুষ হয়তো হাতে গোনা কয়েকজন।
আমরা Google-এ খুঁজে পাই পৃথিবীর সব তথ্য। কিন্তু নিজের মনটা কেন এত অশান্ত—তার উত্তর খুঁজতে গেলে থমকে দাঁড়াতে হয় বারবার।
হয়তো এখানেই এই গল্পের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে। সুন্দর পিচাই শেখান কীভাবে অসম্ভবকে সম্ভব করে সামনে এগিয়ে যেতে হয়। গৌরাঙ্গ দাস মনে করিয়ে দেন—সামনে এগোনোর পাশাপাশি মাঝে মাঝে নিজের ভেতরেও ফিরে তাকাতে হয়। জীবন হয়তো আসলে Google বনাম God নয়। প্রযুক্তি বনাম আধ্যাত্মিকতাও নয়। আসল প্রশ্নটা হলো—আমরা কি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করব, নাকি প্রযুক্তিই একদিন আমাদের ব্যবহার করতে শুরু করবে? সাফল্য মানে কি শুধু কতদূর উঠলাম? নাকি উঠতে উঠতে কতটা মানুষ থেকে যেতে পারলাম—সেটাও?
একই IIT ব্যাচ থেকে বেরিয়ে একজন পৌঁছলেন বিশ্বপ্রযুক্তির শীর্ষে। অন্যজন বেছে নিলেন ঈশ্বর ও মানুষের সেবার নীরব পথ। দুজনের জীবন এক নয়। দুজনের লক্ষ্যও এক নয়।
কিন্তু তাঁদের এই অদ্ভুত সাক্ষাৎ আমাদের সামনে রেখে গেছে এক অসাধারণ মানবিক শিক্ষা— জীবনে বড় হওয়া জরুরি। কিন্তু বড় হতে গিয়ে নিজের ভেতরের মানুষটাকে যেন হারিয়ে না ফেলি।
কারণ পৃথিবী জয় করার পরেও যদি নিজের মনটাই অশান্ত থেকে যায়, তাহলে সেই জয়ের অর্থ আসলে কতটুকু? আর অন্যদিকে—পৃথিবীকে বদলানোর পাশাপাশি যদি একজন মানুষ অন্তত কয়েকজনের জীবনে জ্বালাতে পারেন শান্তি, সাহস বা আশার আলো—সেটাও কি এক ধরনের বিশাল সাফল্য নয়?
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা সুন্দর পিচাই বা গৌরাঙ্গ দাসকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটা আমাদের প্রত্যেককে নিয়ে— আমরা জীবনে ঠিক কী অর্জন করতে চাই? আর সেই পথে চলতে চলতে, নিজের ভেতরের শান্তিটুকু কতটা ধরে রাখতে পারব?



তথ্যসূত্র:
১) Business Today — “God, Not Google”: ISKCON monk Gauranga Das shares stress-free path with Sundar Pichai (June 24, 2025)
২) Tribune India — From IIT to Inner Transformation: Gauranga Das Calls for a Revival of Dharmic Values at IGF London (June 22, 2025)