জরুরি অবস্থা: চিরকালের এক সতর্কবার্তা…
—অর্জুন রাম মেঘওয়াল
(লেখক – কেন্দ্রীয় আইন ও বিচার প্রতিমন্ত্রী (স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত) এবং সংসদ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী)
‘জরুরি অবস্থা’ শব্দটি গভীর অস্বস্তির জন্ম দেয়; প্রায়শই কোনও বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনের তাগিদে প্রচলিত নিয়ম ও কার্যপদ্ধতি স্থগিত করার বিষয়টির সঙ্গে এটি যুক্ত থাকে। বিভিন্ন ধরনের জরুরি পরিস্থিতি আমাদের মনোযোগ ভিন্ন ভিন্নভাবে আকর্ষণ করে, যেমন – হাসপাতালের জরুরি বিভাগগুলি জীবনদায়ী ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে, যা তাৎক্ষণিক চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করে এবং অসংখ্য জীবন রক্ষা করে। বিশ্বে ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের নিঃশেষ হয়ে যাওয়া – এসব বিষয় এমন সব জরুরি পরিস্থিতির সৃষ্টি করে যার মোকাবিলায় সংকীর্ণ ও দ্বিমুখী দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে উঠে আন্তর্জাতিক পরিসরে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। আধুনিক সমাজও যেন নিরন্তর আপৎকালীন উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ভাবনা নিয়ে এগিয়ে চলেছে। তাৎক্ষণিক ফলাফল, চটজলদি সিদ্ধান্ত এবং দ্রুত প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষায় তাড়িত হয়ে অনেকেই যেন এক অঘোষিত ও অদৃশ্য জরুরি অবস্থার মধ্যে জীবনযাপন করছেন। এর বিপরীতে, সম্প্রতি উদযাপিত’আন্তর্জাতিক যোগ দিবস’ প্রশান্তি, ভারসাম্য, স্থিরতা ও মননশীলতার গুরুত্বকে তুলে ধরেছে। বস্তুত, ইতিহাসের পরিক্রমায় মানবজাতি জীবনের অনিবার্য অংশ হিসেবে কোনও না কোনও ধরনের জরুরি পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। তবুও, একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের জাতীয় চেতনায় ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত “জাতীয় জরুরি অবস্থা”র মতো গভীর প্রভাব আর কোনওআপৎকালীন পরিস্থিতিতেতৈরি হয়নি – এটি এমন এক অধ্যায় যা গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা রক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয়।
দেশ আজ “সংবিধান হত্যা দিবস” পালন করছে। জরুরি অবস্থা জারি করার বিষয়টি দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক স্থায়ী কলঙ্ক হয়ে রয়েছে। সেই অন্ধকার ও বেদনাদায়ক অধ্যায়ের অর্ধশতাব্দী পরেও এর প্রভাব ‘গণতন্ত্রের জননী’-র ওপর ছায়া ফেলে চলেছে। এটি নাগরিকদের গণতন্ত্রের সতর্ক প্রহরী হিসেবে থাকার বার্তা দেয় এবং ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার সময় থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতা ও তা অর্জনের জন্য যে মূল্য দিতে হয়েছে, তার গুরুত্বকে তুলে ধরে।
বিতর্ক, সংলাপ ও আলোচনার রীতিনীতির মাধ্যমে লালিত গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের গর্বিত সভ্যতার উত্তরাধিকারী এই জাতি দীর্ঘকাল ধরে অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থাকে জীবনযাত্রার অংশ হিসেবে ধারণ করে এসেছে। প্রাচীন ‘সভা’ ও ‘সমিতি’ এবং পরবর্তীকালে দ্বাদশ শতাব্দীর ‘অনুভব মণ্ডপ’-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলি গণতান্ত্রিক কাঠামোর সুশৃঙ্খল বিবর্তনের উদাহরণ হয়ে আছে। আমাদের সংবিধান একটি জীবন্ত দলিল হিসেবে সেই শাশ্বত নীতিগুলিকে ধারণ করে রেখেছে। ডঃ আম্বেদকর সংবিধানকে ‘যুগের চেতনায় ঋদ্ধ জীবনের বাহন’ হিসেবে অভিহিত করে এই ভাবনাই প্রকাশ করেছিলেন। গণতন্ত্রের সেই অন্তর্নিহিত মূল্যবোধগুলিকে উপেক্ষা করে জরুরি অবস্থা জারি করাটা ছিল সেই পবিত্র বাহনের ওপর এক কাঠামোগত আঘাত।
১৯৭৫ সালের জাতীয় জরুরি অবস্থা কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না; এটি ভারতের গণতান্ত্রিক আলাপ-আলোচনা এবং জনজীবনের কার্যপদ্ধতিকে আমূল বদলে দিয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধীর ক্ষমতা-লোলুপ ও আত্মকেন্দ্রিক প্রশাসন নির্মমভাবে সাংবিধানিক চেতনার তোয়াক্কা না করেএকতরফাভাবে নৈতিক শাসনব্যবস্থার সূক্ষ্ম কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। ১৯৭১ সালের লোকসভা নির্বাচনে অনিয়ম, এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় এবং পদত্যাগের জন্য ক্রমবর্ধমান জনচাপ – এসব ‘অভ্যন্তরীণ গোলযোগ’ ছিল না; বরং এগুলি নিশ্চিতভাবেই ইন্দিরা গান্ধীর নিজের জন্য ছিল এক ‘অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা’। তিনি দীর্ঘকাল ধরে ‘পরিবারতন্ত্র’-এর উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে নিজের অধিকার হিসেবে ভোগ করে আসছিলেন। নিজের এই ‘অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা’ সামাল দিতে গিয়ে দেশের ‘অভ্যন্তরীণ গোলযোগ’ মোকাবিলার জন্য এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা ছিল এক মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত।
ইন্দিরা গান্ধীর গণতন্ত্র-বিরোধী মানসিকতার একটি স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহে। এলাহাবাদ হাইকোর্টে নির্বাচনী মামলা চলাকালীন, ১৯৭৫ সালের ১৯ মার্চ তিনি প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আদালতে সাক্ষ্য দেন। ১৯৭৫ সালের ১২ জুন এলাহাবাদ হাইকোর্টের ২৪ নম্বর কক্ষ থেকে ঘোষিত চূড়ান্ত রায়টির সুদূরপ্রসারী প্রভাব ছিল। তাঁর নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করা হয় এবং তাঁকে ছয় বছরের জন্য কোনো নির্বাচিত পদে আসীন হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে, ২৪ জুন সুপ্রিম কোর্ট তাঁর আবেদনের শুনানিকালে হাইকোর্টের রায়ের ওপর শর্তসাপেক্ষে স্থগিতাদেশ দেয়; এর ফলে তিনি সংসদে উপস্থিত থাকার অনুমতি পেলেও, বৃহত্তর বেঞ্চে বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ভোটদান বা বেতন গ্রহণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হন।
এরই মধ্যে, ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন দিল্লির রামলীলা ময়দানে জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে আয়োজিত বিশাল জনসভা তাঁর উপর চাপ আরও বাড়িয়ে তোলে এবং রাজনৈতিক মহলের সর্বত্র তাঁর পদত্যাগের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, অর্থাৎ এলাহাবাদ হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বিচলিত হয়ে ইন্দিরা গান্ধী ৩৫২ নম্বর অনুচ্ছেদের আওতায় জরুরি অবস্থা ঘোষণার পথ বেছে নেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন মধ্যরাতে, তিনি রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলি আহমেদকে জরুরি অবস্থা ঘোষণার পরামর্শ দেন। এই পরামর্শটি কোনও আনুষ্ঠানিক লেটারহেডের পরিবর্তে সাধারণ কাগজে লেখা বার্তার মাধ্যমে দেওয়া হয়েছিল এবং এর জন্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনুমতিও নেওয়া হয়নি। ২৬শে জুন ভোর ৬টায় মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকা হয়েছিল, যা ছিল কেবলই পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। এভাবেই বিচার বিভাগকে পাশ কাটিয়ে এবং মন্ত্রিসভার যৌথ দায়বদ্ধতার নীতিকে ক্ষুণ্ণ করে তিনি সাংবিধানিক কাঠামোর উপর এক বড় আঘাত হেনেছিলেন। এই ঘটনাটি শাসনব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্তরে প্রাতিষ্ঠানিক সততার গভীর অবক্ষয় এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য স্বৈরাচারী পদ্ধতি প্রয়োগকেই তুলে ধরেছিল।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব করার ফলে কেবল সাংবাদিক ও বিশ্লেষকরা যে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন তা নয়, বরং লক্ষ লক্ষ নাগরিক সত্য, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা জানার অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়েছিলেন। এটি ছিল এমন এক মুহূর্ত যখন জাতির বিবেক কেঁপে উঠেছিল; আর সেই সময়েই গণপরিষদের অবদান এবং সাধারণতন্ত্রের ভিত্তি হিসেবে গড়ে ওঠা গণতান্ত্রিক আদর্শগুলিকে একপাশে ঠেলে দিয়ে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল এক অগণতান্ত্রিক মানসিকতা-প্রসূত স্বৈরাচারী প্রবণতাকে। প্রশাসনের সর্বস্তরেই ‘জাতিকে প্রাধান্য’-এর নীতির উপর ‘পদ-পদবিকে প্রাধান্য’ -এর নীতি যেন ছায়া ফেলেছিল। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার খর্ব করা হয়েছিল এবং যুগের চেতনাকে পদদলিত করা হয়েছিল। ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে বাক্-স্বাধীনতা, সংঘবদ্ধ হওয়ার স্বাধীনতা ও চলাফেরার স্বাধীনতা কেবল কলমের এক আঁচড়ে স্থগিত করে দেওয়া হয়েছিল। ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সুরক্ষার বিষয়টি অর্থহীন হয়ে পড়েছিল এবং সবচেয়ে খারাপ বিষয় হলো, নাগরিকরা ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার অধিকার হারিয়েছিলেন, যে অনুচ্ছেদটিকে সংবিধানের ‘হৃদয় ও আত্মা’ হিসেবে অভিহিত করা হতো। ‘মেইনটেন্যান্স অফ ইন্টারনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট’ এবং ‘ডিফেন্স অফ ইন্ডিয়া রুলস’ -এর কঠোর প্রয়োগের ফলে হাজার হাজার মানুষকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। আমাদের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের এই অন্ধকার ও দমনমূলক অধ্যায়ের ক্ষত প্রতিটি নাগরিককেই বহন করতে হয়েছিল। পরিহাসের বিষয় হ’ল, আজ সেই একই গান্ধী পরিবারের উত্তরসূরীরা কেবল রাজনৈতিক সুবিধার উদ্দেশ্যে পকেটে লাল রঙের সংবিধান নিয়ে এক অন্তঃসারশূন্য ও স্ববিরোধী ভূমিকা পালন করে চলেছেন।
অতীতের ক্ষত স্বীকার করে, মোদি সরকার, ১১ জুলাই, ২০২৪ তারিখের একটি গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে, ২৫ জুনকে ‘সংবিধান হত্যা দিবস’ হিসাবে ঘোষণা করেছে৷ যাঁরা জরুরি অবস্থারবিরোধিতা করেছিলেন এবং গণতন্ত্র রক্ষায় দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁদের অবদানকে স্মরণ ও সম্মান করার জন্যই এই সিদ্ধান্ত৷ সেই সময় আজ অতীত যখন রাষ্ট্রযন্ত্রের অপব্যবহারের মাধ্যমে ভিন্নমতকে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং যুক্তিযুক্ত কণ্ঠকে চূর্ণ করা হয়েছিল। একুশ শতকের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী যে কোনও বিষয়ে এগিয়ে যাওয়ার সর্বোত্তম উপায় হ’ল আলোচনা, বিতর্ক, সংলাপ এবং গণতান্ত্রিক উপায়ে বিরোধের নিষ্পত্তি করা। এভাবেই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলি লালিত হয় এবং গণতান্ত্রিক চেতনা বিকাশ লাভ করে।
যে কোনও’জরুরি’ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা স্বস্তির অনুভূতি নিয়ে আসে এবং এই ধরনের অভিজ্ঞতা আমাদের ভবিষ্যতের পথ চলতে মূল্যবান পাঠ দেয়। বুদ্ধিমানের কাজ হ’ল – অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া। আমরা ‘সংবিধান হত্যা দিবস’কে ঘিরে অন্ধকার অধ্যায়টিকে স্মরণ করতে চাই।আসুন, আমরা যে কোনও উপায়ে সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করার সংকল্প করি। গণতন্ত্র রক্ষার জন্য সঠিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলার জন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।দেশ ও জাতির দায়িত্ব পালনে ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরভূমিকা নিয়ে স্বামী বিবেকানন্দ যে কথা বলেছিলেন, তা স্মরণ করি: “প্রত্যেকটি জাতির একটি পূর্ণতা রয়েছে, প্রতিটি জাতির একটি বার্তা রয়েছে, প্রতিটি জাতির একটি মিশন রয়েছে।”মানবিক মর্যাদা, বহুত্ববাদ, সাংবিধানিকতা এবং নিঃস্বার্থ সেবার যে বার্তা ভারত দিতে পারে, তা একুশ শতকের বিশ্বে আরও স্পষ্টভাবে অনুরণিত হোক। এই আদর্শের প্রতি অবিচল থাকার মাধ্যমে, আমরা নিশ্চিত করতে পারি যে গণতন্ত্র শুধু টিকে থাকে না, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বিকাশ অব্যাহত রাখে।
জরুরি অবস্থা: চিরকালের এক সতর্কবার্তা…







