এই মুহূর্তে ক্রীড়া/অনুষ্ঠান অন্যান্য সাহিত্য সম্পাদকীয় নোটিশবোর্ড

E-Paper

‘বিভাজন বিভীষিকা স্মৃতি দিবস: যে সীমারেখা কেড়ে নিয়েছিল ঘর’— সুমন বিশ্বাস

Published on: August 14, 2026 । 9:09 PM

বিভাজন বিভীষিকা স্মৃতি দিবস: যে সীমারেখা কেড়ে নিয়েছিল ঘর — সুমন বিশ্বাস
১৪ আগস্ট—স্বাধীনতার ঠিক একদিন আগে।
একদিকে আকাশে স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের প্রতীক্ষা, অন্যদিকে ইতিহাসের বুক চিরে নেমে আসা এক অন্ধকার রেখা। সেই রেখার নাম—দেশভাগ।
১৯৪৭-এর দেশভাগ শুধু একটি ভূখণ্ডকে দুই ভাগ করেনি; ছিন্নভিন্ন করেছিল অসংখ্য মানুষের ঘর, সংসার, স্বপ্ন, স্মৃতি আর শিকড়। কত মানুষ একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে জানতে পেরেছিলেন—যে মাটিতে তাঁদের জন্ম, যে উঠোনে তাঁদের শৈশব, যে নদীর জলে তাঁদের প্রজন্মের স্মৃতি—সেই মাটি আর তাঁদের নয়!একটি ট্রেন ছুটে চলেছিল অজানা গন্তব্যের দিকে। জানালার বাইরে পালিয়ে যাচ্ছিল পরিচিত গ্রাম, পুকুর, বটগাছ, মসজিদের আজান, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি। আর ট্রেনের ভিতরে মানুষ আঁকড়ে ধরে রেখেছিল ছোট্ট একটি পুঁটুলি—যার মধ্যে হয়তো ছিল কয়েকটি কাপড়, কিছু পুরনো চিঠি, একটি পারিবারিক ছবি; আর ছিল ফেলে আসা জীবনের অসীম স্মৃতি।
কেউ হারিয়েছিলেন বাবা, কেউ মা, কেউ সন্তান। কেউ হারিয়েছিলেন প্রিয়তম মানুষটিকে। আবার কেউ হারিয়েছিলেন তাঁর নিজের নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা জন্মভূমিটুকু।
বাংলার ইতিহাসেও দেশভাগের ক্ষত অত্যন্ত গভীর। পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে আসা উদ্বাস্তু মানুষের স্রোত শুধু মানুষের স্থানান্তর ছিল না—ছিল এক বিশাল মানবিক যন্ত্রণার ইতিহাস। খালি হাতে আসা সেই মানুষগুলো নতুন করে জীবন গড়েছিলেন; উদ্বাস্তু কলোনির অন্ধকার ঘর থেকে তাঁরা আলো জ্বেলেছিলেন আগামী প্রজন্মের জন্য।
তাই বিভাজন বিভীষিকা স্মৃতি দিবস কোনও ঘৃণার দিন নয়। এটি প্রতিশোধের দিনও নয়। এটি স্মরণ করার দিন—মানুষের কান্নাকে, হারিয়ে যাওয়া শিকড়কে, উদ্বাস্তু মানুষের সংগ্রামকে এবং অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের অসহনীয় যন্ত্রণাকে। ভারত সরকার ২০২১ সালে ১৪ আগস্টকে ‘Partition Horrors Remembrance Day’ হিসেবে পালনের ঘোষণা করে, যাতে দেশভাগের সময় মানুষের দুর্ভোগ ও আত্মত্যাগের স্মৃতি বিস্মৃত না হয়।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এটাই—
মানচিত্রের রেখা দিয়ে দেশ ভাগ করা যায়, কিন্তু মানুষের স্মৃতি ভাগ করা যায় না।
আজও কোনও বৃদ্ধের চোখে জল আসে পুরনো গ্রামের নাম শুনলে। আজও কোনও আলমারির গোপন তাকে রাখা থাকে বিবর্ণ একটি ছবি। আজও কোনও পরিবারের গল্পে ফিরে আসে সেই বাড়ির কথা, যে বাড়িতে আর কখনও ফেরা হয়নি।
সেইসব অশ্রুসিক্ত স্মৃতির প্রতি আজ শ্রদ্ধা জানাই।
আমরা ইতিহাস ভুলব না—কিন্তু ইতিহাসের ক্ষতকে ঘৃণার আগুনেও পরিণত করব না। বরং অতীতের অন্ধকার থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন এক ভারত গড়ব, যেখানে ধর্ম, ভাষা, জাতি বা পরিচয়ের কারণে কোনও মানুষকে নিজের ঘর ছেড়ে পালাতে না হয়।
যে বিভাজন একদিন মানুষকে ঘরছাড়া করেছিল,
আজকের ভারত সেই স্মৃতি থেকে শিখুক—
বিভেদ নয়, সম্প্রীতিই হোক আমাদের ভবিষ্যতের ঠিকানা।
বিভাজনের সেই অন্ধকার দিনে যারা হারিয়ে গিয়েছিলেন,
যারা ঘর হারিয়েও আশা হারাননি,
যারা শূন্য থেকে নতুন জীবন গড়েছিলেন—
তাঁদের সকলের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
বিভাজন বিভীষিকা স্মৃতি দিবসে
স্মরণ করি ইতিহাসকে,
শ্রদ্ধা জানাই মানুষকে,
আর শপথ নিই—
মানবিকতার ভারতকে কখনও বিভক্ত হতে দেব না। 🇮🇳

কেয়া মণ্ডল চৌধুরী

আমার শিকড় ঘাটালে, আর আমার লেখার মূল বিষয় এখানকার সাধারণ মানুষ। তাঁদের জীবনের না-বলা কথাগুলো সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমার প্রধান লক্ষ্য। আপনার আশেপাশে ঘটে যাওয়া এলাকার যেকোনো খবর জানাতে সরাসরি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করুন ৮৯০০০২০০০১ নম্বরে।