রাজীব মহাপাত্র, স্থানীয় সংবাদ, ঘাটাল: জ্বালানির দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি কোথায়? ইথানলের নামে কি সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা চলছে? ভারতের মানুষ আজ বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ দামের পেট্রোল কিনতে বাধ্য। অথচ ভারত বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশগুলির একটি হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলে সেই সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে খুব কমই পৌঁছায়। বরং কেন্দ্র সরকার এখন পেট্রোলে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইথানল মিশিয়ে সেটিকে পরিবেশবান্ধব ও আত্মনির্ভর ভারতের সাফল্য হিসেবে প্রচার করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে ইথানল তুলনামূলকভাবে কম দামের জ্বালানি, সেটি মিশিয়ে বিক্রি করেও কেন পেট্রোলের দাম কমানো হচ্ছে না? এই প্রশ্নের উত্তর আজ দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ জানতে চাইছেন।
ইথানল কী? ইথানল হলো এক ধরনের অ্যালকোহলজাত জ্বালানি, যা আখ, ভুট্টা, ধান, গুড়, আখের রস ও কৃষিজাত অন্যান্য উপাদান থেকে তৈরি হয়। সরকার বলছে, এর ব্যবহার বাড়লে বিদেশ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, কৃষকরা লাভবান হবেন এবং পরিবেশ দূষণ কমবে। এই লক্ষ্যগুলি নীতিগতভাবে ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এর আর্থিক লাভ কার ঘরে যাচ্ছে? কৃষক, সাধারণ মানুষ, নাকি বড় কর্পোরেট সংস্থার কাছে?
ভারত এখনও তার প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৫ শতাংশেরও বেশি বিদেশ থেকে আমদানি করে। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া, ইরাক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহীসহ বিভিন্ন দেশের উপর নির্ভরশীল। সরকারের দাবি, ইথানল মিশ্রণের ফলে এই আমদানি ধীরে ধীরে কমবে। কিন্তু যদি সত্যিই আমদানি কমে, তাহলে সেই সাশ্রয়ের প্রতিফলন পেট্রোলের দামে কোথায়? জনগণের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন যখন পেট্রোলে ২০ শতাংশ পর্যন্ত তুলনামূলক কম দামের ইথানল মেশানো হচ্ছে, তখন পেট্রোলের দাম কেন কমছে না?
সাধারণ অর্থনীতির যুক্তি বলছে— যদি উৎপাদন ব্যয় কমে, তাহলে ভোক্তারও কিছুটা লাভ হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে— পেট্রোলের দাম কমেনি। কেন্দ্রীয় আবগারি শুল্ক ও রাজ্যভিত্তিক নানান করের কারণে জনগণের উপর করের বোঝা বহাল। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও তার পুরো সুবিধা জনগণ পায় না। ইথানল মিশিয়েও একই দামে পেট্রোল বিক্রি করা হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠছে—এটি কী জ্বালানি নীতি, নাকি রাজস্ব আদায়ের নীতি?
ইঞ্জিনের ক্ষতির আশঙ্কা: বিশেষজ্ঞদের একাংশ জানিয়েছেন— পুরোনো মোটরসাইকেল ও গাড়ির ক্ষেত্রে E20 সবসময় উপযোগী নাও হতে পারে। রাবারের পাইপ, সিল ও কিছু যন্ত্রাংশে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। ইথানলের শক্তি ঘনত্ব কম হওয়ায় কিছু ক্ষেত্রে মাইলেজ কমতে পারে। অনেক পুরোনো গাড়ির মালিক অতিরিক্ত রক্ষণাবেক্ষণের খরচের আশঙ্কা করছেন। সরকার বলছে নতুন E20-উপযোগী গাড়িতে সমস্যা নেই। কিন্তু কোটি কোটি পুরোনো গাড়ির মালিকের স্বার্থ কীভাবে রক্ষা হবে, সেই প্রশ্ন এখনও পুরোপুরি মেটেনি।
কৃষকের নামে, লাভ কার? সরকার বলছে ইথানল উৎপাদনে কৃষক লাভবান হবেন। কিন্তু সমালোচকদের বক্তব্য— বড় চিনিকল ও বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীই বেশি সুবিধা পাচ্ছে। ক্ষুদ্র কৃষক ন্যায্য মূল্য সবসময় পাচ্ছেন না। খাদ্যশস্যকে জ্বালানির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের ফলে ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নও উঠতে পারে। তাহলে জনগণের অধিকার কোথায়? সাধারণ মানুষের দাবি হওয়া উচিত— বিশুদ্ধ পেট্রোলের বিকল্প রাখা হোক। E20-এর প্রকৃত অর্থনৈতিক লাভের হিসাব প্রকাশ করা হোক। পুরোনো গাড়ির মালিকদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হোক। জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে পূর্ণ স্বচ্ছতা আনা হোক। ইথানল মিশ্রণের ফলে সরকারের সাশ্রয় কত এবং জনগণ তার কতটা সুবিধা পাচ্ছেন—সাদা কাগজে প্রকাশ করা হোক। দেশের মানুষ পরিবেশ রক্ষা চায়, কৃষকের উন্নতি চায়, আমদানি নির্ভরতা কমুক—সেটাও চায়। কিন্তু সেই নামে যদি সাধারণ মানুষের পকেট কাটা হয়, তবে তার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা গণতান্ত্রিক অধিকার। ইথানল যদি সস্তা হয়, পেট্রোল সস্তা হচ্ছে না কেন? আমদানি কমলে সেই সাশ্রয়ের টাকা কোথায় যাচ্ছে? কেন জনগণকে একই দামে কম শক্তিসম্পন্ন জ্বালানি কিনতে বাধ্য করা হবে? একটি গণতান্ত্রিক দেশে জনগণের কাছ থেকে তথ্য গোপন করে নয়, বরং স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং মানুষের স্বার্থকে সর্বাগ্রে রেখেই জ্বালানি নীতি নির্ধারণ করা উচিত। জনগণের অর্থে সরকার চলবে, জনগণের উপর বোঝা চাপিয়ে নয়। প্রতারণা নয়—স্বচ্ছ জ্বালানি নীতি চাই।







